জাতীয় ডেস্ক
নতুন সরকার গঠনের পর জনপ্রশাসনে ব্যাপক পুনর্গঠন ও শুদ্ধি অভিযানের সূচনা করেছে। বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শের কর্মকর্তাদের আধিপত্য কাটিয়ে প্রশাসনের নিয়োগ ও দায়িত্ব বিতরণ নতুনভাবে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং অফিস কার্যক্রমের গতি বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকার সূত্রে জানা গেছে, ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথগ্রহণের পর মন্ত্রিসভার সদস্যরা সচিবালয়ে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও সচিবালয়ে নিয়মিত উপস্থিত থেকে অফিস কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের উপস্থিতি ও কর্মপদ্ধতি মনিটর করছেন। সূত্র জানায়, সচিবালয়ে আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। তবে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পাওয়া কিছু রাজনৈতিক আদর্শের কর্মকর্তা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
প্রসঙ্গত, বিগত সরকারের সময় প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের আদর্শের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করা হয়েছিল। বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা এই ব্যাচভিত্তিক রাজনীতি নিরসন এবং প্রশাসনে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন করা। এতে কিছু অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিবের বদলি এবং প্রয়োজনে ওএসডি করা হতে পারে। প্রকল্প পরিচালকদের নিয়োগও পুনর্বিবেচনার আওতায় এসেছে। সরকারের নিকটাধীন একটি সূত্র জানায়, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে তালিকা তৈরি এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে সংবিধান ও আইন অনুসারে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “সচিবরা সরকারের অংশ; কোনো দলের নয়। তাদের মেধা এবং কাজের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে।” সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সরকারের লক্ষ্য মেধাবী ও যোগ্য কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো এবং বিশেষ আদর্শে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রয়োজনমতো সরিয়ে নতুন মুখ আনাসহ প্রশাসনকে দক্ষ ও ফলপ্রসূ করা।
বর্তমানে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া নয় সচিবের চুক্তি বাতিল এবং তিন সচিবকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গতকালও সচিব পর্যায়ে কিছু রদবদল হয়েছে। দুই সচিবের দপ্তর বদল করা হয়েছে এবং অবসরপ্রাপ্ত সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিবদের আন্তমন্ত্রণালয় পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চলছে।
অন্যদিকে, অফিস সময় নিয়ে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অতীতের তুলনায় অনেক কর্মকর্তা অফিসে দেরিতে আসতেন, যা কাজের গতিতে প্রভাব ফেলেছিল। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অফিসে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করার নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯’ এবং ‘সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০২৪’ অনুযায়ী সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে সকাল ৯টার মধ্যে দপ্তরে উপস্থিত থাকতে হবে। অফিস সময় শেষ হওয়ার আগে অনুমতি ছাড়া দপ্তর ত্যাগ করা যাবে না।
প্রত্যেক মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা অনুসারে অধীন দপ্তর/সংস্থাগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঠিকভাবে অফিসে উপস্থিতির জন্য তদারকি করতে বলা হয়েছে। বিশেষভাবে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রমজান মাসে অফিস ত্যাগের সময় বিকাল ৩টা ৩০ মিনিট এবং রমজান পরবর্তী সময়ে বিকাল ৫টার আগে হবে না। নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, সাপ্তাহিক বা অন্যান্য ছুটির দিনে অফিস ত্যাগের জন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি বাধ্যতামূলক।
সাবেক সচিব এ কে এম আউয়াল মজুমদারের মতে, “নতুন সরকার কিছু রদবদল করবে এবং কাজের গতি বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেবে। প্রকৃত মেধাবী কর্মকর্তা হলে নতুন ব্যবস্থাপনায় সমস্যার মুখোমুখি হবেন না। কর্মকর্তাদের দলবাজ হওয়া উচিত নয়।”
সংক্ষেপে, নতুন সরকার প্রশাসনে স্বচ্ছতা, মেধাভিত্তিক নিয়োগ এবং কার্যক্রমে দক্ষতা বৃদ্ধি করতে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। শুদ্ধি অভিযান ও নিয়োগ পুনর্বিন্যাস সরকারের প্রশাসনিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


