আবহাওয়া ডেস্ক
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ভূমিকম্পের তীব্রতা এবং ঘনত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশেষজ্ঞরা সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তথ্য অনুযায়ী, দেশীয় ভূখণ্ডে সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল ১৯৩০ সালে, যা প্রায় ৯৬ বছর আগে সংঘটিত। এর আগে ৬৫ বছরের ব্যবধানে দেশ জুড়ে ছয়টি বড় ভূমিকম্প ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেহেতু বেশিরভাগ টেকটোনিক প্লেট দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল ছিল, তাই যে কোনো সময় নতুন তীব্র ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে। ফলে বাসাবাড়ি, সরকারি ও বেসরকারি অবকাঠামো ভূমিকম্প সহনীয় করে তোলাই প্রস্তুতির মূল অগ্রাধিকার।
গত বছরের ২১ নভেম্বর নরসিংদীতে দেশের অভ্যন্তরে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানেছিল। ইন্দো-বার্মা টেকটোনিক প্লেটের ওই অংশে এই কম্পনের ফলে কয়েকজন নিহত হন। এরপর মাত্র তিন মাসের মাথায়, গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্পে আবার কেঁপে উঠেছে সারাদেশ। চলতি মাসের মধ্যে ইতিমধ্যে ১০টি ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়েছে, যা গড়ে দুই দিনে একবারের হার নির্দেশ করছে।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, “যদি ভূমিকম্প বারবার ঘটে, প্লেটের সীমান্তে শক্তি জমা হয়। শক্তি যখন আর নির্গত হওয়ার জায়গা না পায়, তখন তা বিস্ফোরণের আকারে বের হয়। এমন পরিস্থিতিতে আরও বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আমরা যখন ছোট কম্পনগুলো দেখি, সেগুলো হলো শক্তির মুক্তির প্রক্রিয়া, যা ভবিষ্যতের বড় কম্পনের পূর্বাভাস হতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “বিল্ডিং ও স্থাপনার ভূমিকম্প সহনীয়তা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। ইঞ্জিনিয়ারদের প্রশিক্ষণ ও বাড়ি-স্থাপনার মালিকদের সচেতন করা প্রয়োজন।”
বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রাজধানী ঢাকা এবং উত্তরের কিছু জেলা। ১৮৯৭ সালের ১২ জুন ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক’ ছিল ৮ মাত্রারও বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ভেতরে এবং পার্শ্ববর্তী বড় প্লেট বাউন্ডারি ও ফল্ট লাইনের ক্ষেত্রে প্রতি ১০০ থেকে ১৫০ বছর পরপর ৭ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। ৮ বা তার অধিক মাত্রার ভূমিকম্প ২৫০ থেকে ১,০০০ বছরের ব্যবধানে ঘটতে পারে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধুমাত্র ঢাকাতে ২১ লাখ বাসাবাড়ি রয়েছে, যার প্রায় ৩০ শতাংশ ৬ তলার বেশি। এসবের ৯০ শতাংশই ভূমিকম্প সহনীয় নয়। সারাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন এবং অবকাঠামো রয়েছে শত শত। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী মন্তব্য করেছেন, “নতুন ছোট ভূমিকম্প নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগের প্রয়োজন নেই। তবে অতীতে সংঘটিত বড় ভূমিকম্পগুলো বিবেচনায় ভবিষ্যতের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, ঘন ঘন কম্পনের প্রেক্ষাপটে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি অবকাঠামোর ভূমিকম্প সহনীয়তার মূল্যায়ন, পরিকল্পিত প্রশিক্ষণ এবং নির্মাণে আধুনিক ভূমিকম্প-প্রতিরোধী নীতি প্রণয়নই মূল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। পাশাপাশি, সাধারণ জনগণকে সচেতন করা, জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদ স্থান নির্ধারণ এবং প্রাথমিক প্রতিকার ব্যবস্থা গ্রহণ করাও অপরিহার্য।
উল্লেখ্য, দেশের ভূ-প্রকৌশল ও জরুরি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা মান উন্নয়ন ছাড়া, ঘন ঘন ভূমিকম্পের ফলে জনজীবন ও অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্ভাবনা কমানো সম্ভব হবে না।


