ইরানে অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদ গঠন

ইরানে অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদ গঠন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটিতে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি ‘অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদ’ গঠন করা হয়েছে। রোববার বাংলাদেশ সময় সকালে ইরান সরকারিভাবে খামেনির নিহত হওয়ার তথ্য স্বীকার করে। এর আগে শনিবার রাতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র পৃথকভাবে তার নিহত হওয়ার ঘোষণা দেয়।

ইরানের সরকারি বার্তাসংস্থা ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সি (ইরানা)-এর তথ্য অনুযায়ী, নবগঠিত অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদের অন্য দুই সদস্য হলেন দেশটির বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেন মোহসেনি-এজেই এবং প্রভাবশালী সংস্থা গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন জ্যেষ্ঠ আলেম। সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পদ শূন্য হলে নতুন নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পরিচালনার জন্য এ ধরনের পরিষদ গঠনের বিধান রয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হয়। ওই অভিযানের পর শনিবার রাতেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু খামেনির নিহত হওয়ার দাবি করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একই তথ্য নিশ্চিত করেন। পরদিন রোববার ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি স্বীকার করে।

৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ছিলেন। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর তিনি এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোতে ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রভাব সুদৃঢ় হয়। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী, বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ও গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানের ওপর সরাসরি কর্তৃত্ব রাখেন। ফলে খামেনির সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা রাষ্ট্র পরিচালনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করত।

ইরানের ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর প্রণীত সংবিধানের ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মৃত্যুবরণ করলে, পদত্যাগ করলে অথবা দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে বিশেষজ্ঞ পরিষদ নতুন নেতা নির্বাচনের আগ পর্যন্ত একটি অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদ রাষ্ট্রের নির্বাহী দায়িত্ব পালন করবে। এই পরিষদ সাধারণত প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন আলেমকে নিয়ে গঠিত হয়। বর্তমান ঘোষণাও সেই সাংবিধানিক কাঠামোর ভিত্তিতেই করা হয়েছে।

খামেনির মৃত্যুর ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে আরও তীব্র হয়। পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে ইরানের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিরোধ বিদ্যমান ছিল। এ প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতি দেশটির অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে কি না, তা এখন আলোচনায় রয়েছে।

তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার উত্তরসূরি নির্বাচন একটি নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। বিশেষজ্ঞ পরিষদ নামে পরিচিত সংস্থাটি নতুন নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করে। অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদ দায়িত্ব গ্রহণ করলেও এটি মূলত অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিশেষজ্ঞ পরিষদের ওপর নির্ভরশীল।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সামরিক প্রস্তুতি এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতার দিকে আন্তর্জাতিক মহলের নজর রয়েছে। নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া এবং সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের পরবর্তী পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ