অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বিশ্ব তেলবাজারে অস্থিরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাব হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ দশমিক ৭৭ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সোমবার (৯ মার্চ) আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও সংবাদসূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তীব্র হওয়ার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। গত সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার পর নতুন করে এই মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে। জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তেলের বাজারে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ইরান উপসাগর এবং আরব সাগরের সংযোগস্থল এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে হামলা-পাল্টা হামলার আশঙ্কায় অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ এই পথ ব্যবহার থেকে বিরত থাকছে। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি করিডোর। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো—বিশেষ করে সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতার—এই প্রণালী ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি রপ্তানি করে থাকে। ফলে এই পথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তা সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান জেপি মর্গানের প্রধান অর্থনীতিবিদ ব্রুস কাসম্যানের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি এখনও মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। আর এই জ্বালানি সম্পদের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা হয়।
তার মতে, সংঘাত অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলে মূল্য আবার কিছুটা কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরও জানান, রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার স্থায়ী সমাধান না হলে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮০ ডলারের আশেপাশে স্থিতিশীল থাকতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি মূল্যের এই অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তেলের উচ্চমূল্যের কারণে চলতি বছরের প্রথমার্ধে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ০.৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার ফলে ভোক্তা পর্যায়ে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দাম গড়ে প্রায় ১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে তেলের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণত বহুমাত্রিক প্রভাব সৃষ্টি করে। জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে এবং এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কূটনৈতিক সমাধান এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মত।


