অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের উত্থান দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্থিতিশীল হওয়ার কোনো ইঙ্গিত না থাকায় চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে এবং ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে।
সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৪ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দামও প্রায় ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১১২ ডলারের বেশি দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে বিশ্ব তেল সরবরাহে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হয়ে উঠতে পারে।
তেলের দামের এই উত্থান বিশ্ব শেয়ারবাজারেও সরাসরি প্রতিফলিত হয়েছে। সোমবার এশিয়ার বিভিন্ন শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরু হতেই বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক প্রায় ৬ শতাংশ হ্রাস পেয়ে লেনদেন বন্ধ হওয়ার দিকে ধাবিত হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচকও ৭ শতাংশের বেশি কমেছে। হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক প্রাথমিকভাবে প্রায় ২.৬ শতাংশ পতনের মুখে পড়েছে, এবং অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স ২০০ সূচকও উল্লেখযোগ্য দরপতনের সম্মুখীন হয়েছে।
সোমবার সকালে লেনদেন শুরু হওয়ার পর নিক্কেই সূচক প্রায় ৫২ হাজার পয়েন্টে নেমে আসে। একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচকেও ৬ শতাংশের বেশি পতন দেখা যায়। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের শেয়ারবাজারেও ৩ শতাংশের বেশি দরপতন হয়েছে। যদিও ওয়াল স্ট্রিটে লেনদেন শুরু হয়নি, প্রি-মার্কেট তথ্য অনুযায়ী ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল এভারেজ ও এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকও নিম্নমুখী প্রবণতা নিয়ে দিন শুরু করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তেলের দাম সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পেলে তা দীর্ঘমেয়াদি হবে না। একই ধরনের মন্তব্য দেশটির জ্বালানিমন্ত্রীও করেছেন। তারা মনে করেন, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতেও বর্তমান অস্থিরতা কয়েক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বৈশ্বিক অর্থনীতি এখনও নির্ভরশীল। জেপিমরগ্যানের প্রধান অর্থনীতিবিদ ব্রুস কাসম্যান জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে স্বল্প সময়ের মধ্যে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। তবে সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে এলে দাম কিছুটা স্থিতিশীল হওয়া সম্ভব।
বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এই বাজার অস্থিরতার প্রভাব ইতিমধ্যেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে এশিয়ার প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোতে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি হ্রাসের জন্য শেয়ার বিক্রি করছে, যা স্থানীয় বাজারে দরপতন এবং বিনিয়োগ স্থিতিশীলতার জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি জ্বালানি খাতে মূল্যস্ফীতি এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করতে পারে, যা বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক নীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক তেলের বাজার ও বিশ্ব শেয়ারবাজারের উপর এই ধরনের রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়মিতভাবে প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা এবং তেলের সরবরাহ ব্যবস্থার নিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


