মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে তেলের দামে অস্থিরতা, উচ্চ পর্যায় থেকে কিছুটা কমেছে ব্রেন্ট ক্রুড

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে তেলের দামে অস্থিরতা, উচ্চ পর্যায় থেকে কিছুটা কমেছে ব্রেন্ট ক্রুড

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৯ দশমিক ১৩ মার্কিন ডলার পর্যন্ত উঠে যায়। পরবর্তীতে ইরানকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল আংশিক স্বাভাবিক হওয়ার ফলে শুক্রবার (২০ মার্চ) দাম কিছুটা কমে আসে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুক্রবার জিএমটি সময় বিকেল ৪টা ১০ মিনিট নাগাদ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম নেমে দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৯ দশমিক ৭৫ ডলারে। যদিও এটি আগের দিনের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ১ শতাংশ বেশি, তবে দিনের সর্বোচ্চ মূল্য থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। তবুও দাম এখনও ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে, যা বাজারে অনিশ্চয়তা ও উচ্চ ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার ঘটনাগুলো সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী এই অঞ্চলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরসংলগ্ন স্থাপনাগুলোতে হামলার পর সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে।

সংঘাতের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলও ব্যাহত হয়। বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এর সাময়িক বন্ধ হয়ে যাওয়া বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। তবে ইরানের সঙ্গে আলোচনার পর কয়েকটি দেশের জন্য এই পথ আংশিকভাবে উন্মুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে, যা বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করেছে।

এদিকে ইরানের জ্বালানি খাতে সম্ভাব্য হামলা এড়ানোর বিষয়ে কিছু প্রতিশ্রুতির কথাও সামনে এসেছে, যা মূল্য কমার পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি তেহরানের তেল ও গ্যাসক্ষেত্রে সরাসরি আক্রমণ না করার ইঙ্গিত বাজারে ঝুঁকি কিছুটা কমিয়েছে।

ফেব্রুয়ারির শেষদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির পর থেকে তেলের দামে উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন দেখা যায়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে বলে বাজার তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এই সময়কালে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের প্রভাব বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তোলে।

অন্যদিকে, দক্ষিণ ইরানের পারস্য উপসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগার ও প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে হামলার ঘটনা সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। এসব স্থাপনা আঞ্চলিক জ্বালানি উৎপাদন ও রপ্তানির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় ইরান আঞ্চলিক বিভিন্ন দেশে অবস্থিত কিছু তেল স্থাপনাকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করে সতর্কতা জারি করেছে। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনা ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এই ধরনের পাল্টাপাল্টি হুমকি আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে জ্বালানি বাজারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের দাম নির্ধারণে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি একটি বড় উপাদান হিসেবে কাজ করছে। সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা এবং সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানে রাখছে। ফলে বাজারে স্বল্পমেয়াদি ওঠানামা অব্যাহত থাকতে পারে।

সামগ্রিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি। কূটনৈতিক সমাধান বা উত্তেজনা প্রশমনের অগ্রগতি না হলে তেলের বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ