আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিশ্বব্যাপী চলমান জ্বালানি পরিস্থিতিকে একযোগে দুটি তেল সংকট এবং একটি গ্যাস সংকটের সম্মিলিত রূপ হিসেবে উল্লেখ করে এর প্রভাব মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরল। সোমবার (২৩ মার্চ) অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরার ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ফাতিহ বিরল বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং বহুমাত্রিক সংকটে পরিণত হয়েছে। তার মতে, চলমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে কোনো দেশই বিচ্ছিন্ন থাকতে পারবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং বাজারে অস্থিরতা কমাতে এখনই সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
আইইএ প্রধান আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত পরিস্থিতির কারণে ওই অঞ্চলের অন্তত ৪০টি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, যা বৈশ্বিক বাজারে চাপ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থার ওপর এই প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইইএ ইতোমধ্যে এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জরুরি তেলের মজুদ বাজারে ছাড়ার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে বলে জানান ফাতিহ বিরল। তিনি বলেন, বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্য স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এর আগে চলতি মাসের শুরুতে আইইএ সদস্য দেশগুলো যৌথভাবে বিশ্ববাজারে রেকর্ড পরিমাণ ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দেয়, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ফাতিহ বিরল উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে আইইএ। পরিস্থিতির অবনতি হলে বা সরবরাহ ঘাটতি আরও বাড়লে অতিরিক্ত মজুত তেল বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতিও রয়েছে সংস্থাটির। তিনি বলেন, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণে আইইএ প্রস্তুত রয়েছে।
এছাড়া, তিনি হরমুজ প্রণালির গুরুত্বের ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করেন। বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল সরবরাহ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। বিরল বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্ন তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা বর্তমান সংকট নিরসনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই রুটে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন একত্রে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে। এর ফলে তেলের মূল্য বৃদ্ধি, জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, কৌশলগত মজুদ ব্যবস্থাপনা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আইইএ প্রধানের বক্তব্যে সেই দিকনির্দেশনাই প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


