আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করেছে। এ ব্যবস্থার আওতায় জাহাজ তল্লাশি, নির্দিষ্ট করিডোর ব্যবহার এবং ট্রানজিট ফি আরোপ করা হচ্ছে। অন্তত একটি তেলবাহী জাহাজকে পারাপারের অনুমতি পেতে প্রায় ২০ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
সামুদ্রিক শিল্প সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান একটি নিয়ন্ত্রিত নৌপথ নির্ধারণ করেছে, যা লারাক দ্বীপের নিকট দিয়ে অতিক্রম করে। এই করিডোর ব্যবহার করে জাহাজগুলোকে ইরানি কর্তৃপক্ষের সরাসরি পর্যবেক্ষণের আওতায় এনে পারাপারের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। অন্তত নয়টি জাহাজ এই নির্ধারিত রুট ব্যবহার করে প্রণালি অতিক্রম করেছে বলে জানা গেছে। তবে পারাপারের ক্ষেত্রে সব জাহাজকেই ট্রানজিট ফি প্রদান করতে হচ্ছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) পরিচালিত একটি নিবন্ধন ও যাচাইকরণ ব্যবস্থার অধীনে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করছে। এই ব্যবস্থার আওতায় জাহাজগুলোকে আগে থেকেই অনুমোদন বা ক্লিয়ারেন্স নিতে হবে। এ বিষয়ে ভারত, পাকিস্তান, ইরাক, মালয়েশিয়া ও চীনসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশটি একটি নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রানজিট ফি ও কর আরোপ করা হতে পারে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় এই প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি; বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে সম্পন্ন হয়।
বর্তমানে আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলসীমায় প্রায় ২০ হাজার নাবিক এবং প্রায় ২ হাজার জাহাজ আটকা পড়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সামুদ্রিক পরিবহন কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা একটি জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে এবং আটকে পড়া জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য একটি সমন্বিত সুরক্ষা কাঠামো তৈরির আহ্বান জানিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাতের পর থেকে ইরান অনুমোদন ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে আইআরজিসি সতর্কবার্তা জারি করে জানায়, অনুমতি ছাড়া প্রবেশকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। এর ফলে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি তাদের কার্যক্রম সীমিত করেছে বা বিকল্প রুট ব্যবহার শুরু করেছে।
সংঘাত শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ২০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে অন্তত ১৭টি ঘটনার তথ্য নিশ্চিত হয়েছে, যেখানে বেশ কয়েকজন নাবিক হতাহত হয়েছেন। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ অবস্থায় সামুদ্রিক বিমা খাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাকে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করায় ‘ওয়ার রিস্ক ইন্স্যুরেন্স’ বা যুদ্ধকালীন ঝুঁকি বিমার প্রিমিয়াম কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ফলে জাহাজ মালিকদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে, যা সামগ্রিক পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অচলাবস্থা আঞ্চলিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি করছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ১১৯ ডলারে পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।


