রূপপুরে ৭ এপ্রিল শুরু হচ্ছে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে নতুন ধাপ

রূপপুরে ৭ এপ্রিল শুরু হচ্ছে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে নতুন ধাপ

 

বাংলাদেশ ডেস্ক

দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে ইউনিট-১-এর রিয়্যাক্টরে জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম আগামী ৭ এপ্রিল শুরু হতে যাচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন এ তথ্য জানিয়েছেন। একাধিকবার সময় পেছানোর পর এই ধাপ শুরু হওয়ায় প্রকল্পটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, জ্বালানি লোডিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় এক মাস সময় লাগতে পারে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান স্থাপনা রিয়্যাক্টর প্রেসার ভেসেলের ভেতরেই জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম সংযোজন করা হয়, যা ফুয়েল লোডিং নামে পরিচিত। প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং নিরাপত্তা-সংবেদনশীল। খনি থেকে আহরিত ইউরেনিয়াম প্রক্রিয়াজাত করে ছোট দানাদার ‘পেলেট’ তৈরি করা হয়। এসব পেলেট ধাতব নলের ভেতরে স্থাপন করে ফুয়েল রড তৈরি করা হয় এবং একাধিক রড একত্রে সংযুক্ত করে ফুয়েল অ্যাসেম্বলি গঠন করা হয়। রূপপুরের প্রথম ইউনিটে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপন করা হবে, যা ইতোমধ্যে রাশিয়া থেকে এনে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এক বছরের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ করবে। ফুয়েল লোডিং সম্পন্ন হলে পরবর্তী ধাপে নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া শুরু হবে, যার মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসান জানিয়েছেন, ফুয়েল লোডিংয়ের পরবর্তী প্রতিটি ধাপ কঠোর পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন করা হবে এবং একটি ধাপ সফলভাবে শেষ না হলে পরবর্তী ধাপে যাওয়া হবে না।

সাধারণত একটি পারমাণবিক চুল্লিতে ইউরেনিয়াম-২৩৫ ফুয়েল লোডিং সম্পন্ন করতে প্রায় ৩০ দিন সময় লাগে। তবে অনুকূল পরিস্থিতিতে দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটি ২১ দিনের মধ্যেও সম্পন্ন করা সম্ভব। প্রাথমিকভাবে কম ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা হয়, যা ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়। এ প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের আগে একাধিক ধাপের পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করা হয়, যাতে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত থাকে।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) জানিয়েছে, রূপপুর থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রহণের জন্য জাতীয় গ্রিড প্রস্তুত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইন নির্মাণ শেষ হয়েছে। তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ সঞ্চালনের ক্ষেত্রে গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি নির্ধারিত মানে বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে সীমিত পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে এবং ধীরে ধীরে তা বাড়ানো হবে। পুরো সিঙ্ক্রোনাইজেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে তিন থেকে চার মাস সময় লাগতে পারে।

ফুয়েল লোডিংয়ের পর পূর্ণ সক্ষমতায়, অর্থাৎ প্রায় ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হতে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

রূপপুর প্রকল্প আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। নির্মাণ, জ্বালানি লোডিং, পরিচালনা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রতিটি ধাপে আইএইএ পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করছে। একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর আগে প্রায় ১৯টি ধাপ অতিক্রম করতে হয়, এবং প্রতিটি ধাপে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়ন করা হয়। এছাড়া দেশের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বিএইআরএ) কাজ করছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে পারমাণবিক প্রকৌশল, উন্নত বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি এবং সিভিল প্রকৌশলের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ২০১৩ সালে সমীক্ষা এবং ২০১৫ সালে নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির আওতায় প্রকল্পে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।

প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার সম্ভাব্য সময় ২০২৭ সালের প্রথমার্ধ। দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে এবং এটি আগামী বছরের শেষ নাগাদ সম্পন্ন হতে পারে। পুরো প্রকল্প ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মাধ্যমে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জিত হবে।

প্রকল্পটি পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তোলা হয়েছে, যাদের একটি অংশ রাশিয়ায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে রুশ বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে কেন্দ্র পরিচালিত হবে এবং ধীরে ধীরে দেশীয় জনবল দায়িত্ব গ্রহণ করবে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ