ঢাকা: বিএনপি’র সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীকে ২০১২ সালে গুম করার ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। এ ঘটনায় সাবেক ডিজিএফআই মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জিজ্ঞাসাবাদ করছে। জিজ্ঞাসাবাদে শেখ মামুন খালেদ ইলিয়াস আলীকে অপহরণের পেছনের পরিকল্পনা, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রক্রিয়া সম্পর্কিত তথ্য দিয়েছেন।
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, গুমের পরিকল্পনা তৎকালীন সরকারের নির্দেশে গ্রহণ করা হয়েছিল। ইলিয়াস আলী টিপাইমুখ বাঁধ ও পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তি নিয়ে বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। ওই বাঁধ ও চুক্তি সংশ্লিষ্ট দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সরকারের রোষানলে পড়েন তিনি। মামুন খালেদ জানান, গুম কার্যক্রমের জন্য বিশেষভাবে ডিজিএফআই ও র্যাবের একটি টিম তৈরি করা হয়েছিল। র্যাব-১ প্রধান ভূমিকায় ছিল এবং ডিজিএফআইয়ের কিছু কর্মকর্তা সহযোগিতা করেন। গুম প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দেন মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান।
জিজ্ঞাসাবাদে শেখ মামুন খালেদ আরও জানিয়েছেন, সব প্রস্তুতি শেষে ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল ইলিয়াস আলী ও তার ব্যক্তিগত ড্রাইভারকে বনানী থেকে র্যাব-১ সদর দপ্তরে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ থেকে ২০ এপ্রিলের মধ্যে ইলিয়াস আলীকে হত্যা করে ধলেশ্বরী নদীতে ফেলা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া জানা যায়, ২১ এপ্রিল ইলিয়াস আলীর স্ত্রী ও সন্তানরা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন। সেই সময় জিয়াউল আহসানকে ফোনে বিষয়টি জানালে, ইলিয়াস আলীর চূড়ান্ত গুম করার নির্দেশ পাওয়া যায়। এই ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎক্ষণাৎ কার্যক্রম শুরু করে এবং সংশ্লিষ্ট র্যাব ও ডিজিএফআই কর্মকর্তাদের নজরদারিতে রাখে। মামুন খালেদকে গ্রেপ্তারের পর ধারাবাহিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
মাহামান্য আদালত মামুন খালেদকে ৫ দিনের রিমান্ড শেষে আরও সাত দিনের রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেছে। পরে আদালত ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামুন খালেদ জানিয়েছেন, গুম প্রক্রিয়ার সার্বিক দিকনির্দেশনা তিনি নিজেই দিয়েছিলেন। ডিজিএফআইয়ের দু’জন মেজর প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করেন এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা এ বিষয়ে অবগত ছিলেন।
পরিবার ও বিএনপি নেতারা দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে ইলিয়াস আলী বেঁচে আছেন কি না, তার সঠিক তথ্য জানতে পারেননি। তৎকালীন সরকার বা অন্য কোনো সরকারি সূত্র থেকে এ নিয়ে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এই সময় কোনো সরকারি তদন্তও করা হয়নি। গণ-অভ্যুত্থানের পর ডিজিএফআই নিয়ন্ত্রণাধীন বন্দিশালার কিছু গুমের শিকার মুক্তি পান। তবে ইলিয়াস আলী এখনও নিখোঁজ। জাতীয় সংসদে তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদী লুনাও বিষয়টি তুলে সংসদে প্রশ্ন করেন।
তদন্ত সূত্রে বলা হয়েছে, গুমের রাতে ইলিয়াস আলী দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে শেরাটন হোটেলে বৈঠক করছিলেন। রাত ১১টার দিকে তিনি বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। এ সময় তার গাড়ি অনুসরণ করছিল জিয়াউল আহসানের গুম টিম। মহাখালী থেকে বনানীর ২ নম্বর সড়কে গাড়ি থামিয়ে, ড্রাইভার ও আনসারসহ তাকে অপহরণ করা হয়। এরপর তাকে র্যাব-১ সদর দপ্তরে নেওয়া হয়।
বর্তমানে তদন্তকারীরা র্যাব ও ডিজিএফআইয়ের সকল সংশ্লিষ্ট সদস্যকে নজরদারিতে রেখেছেন। অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, আবার কেউ দেশে নেই বা অবসর গ্রহণ করেছেন। তবে কিছু কর্মকর্তা এখনও চাকরিতে আছেন এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।


