আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান হরমুজ প্রণালিতে স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ব বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করছে। পারস্য উপসাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের মাধ্যমে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরানের কৌশলগত অবস্থান ও সামরিক সক্রিয়তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরেই হরমুজ প্রণালির ওপর রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বৃদ্ধির মাধ্যমে বিশ্বকে একটি প্রভাবশালী অবস্থানে রাখতে চেয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ইরানের জন্য পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়ে বেশি কার্যকর উপায়। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক কার্নেগি এন্ডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট মারওয়ান মুয়াশার বলেন, ‘ইরান আবিষ্কার করেছে যে, হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করা তাদের জন্য পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়ে বেশি কার্যকর।’
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে যৌথ সামরিক প্রস্তুতির মধ্যেও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রয়েছে। ইরানি সামরিক বাহিনী এবং তাদের সংযুক্ত ছায়াশক্তি এই অঞ্চলে ট্যাংকারে আক্রমণ চালাচ্ছে এবং টোল বা মাশুল আদায়ের মাধ্যমে জাহাজ চলাচলে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই জলপথ খুলতে ব্যর্থতার কারণে ইরানের দিকে কঠোর বার্তা দেন। তবে কয়েকদিন আগে তিনি ইতিবাচক সুরে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিকভাবে খুলে যাবে, কারণ ইরানের পুনর্গঠনের জন্য তাদের তেল বিক্রি অপরিহার্য।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরান এখন ‘রাজনৈতিক সহনশীলতা ও টিকে থাকার’ কৌশলে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছে। ইরানি আইনপ্রণেতা মোহাম্মদরেজা রেজাই কুচি উল্লেখ করেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা প্রদানের বিনিময়ে টোল আদায় করা স্বাভাবিক। গত সপ্তাহে ইরানি নেতারা একটি পরিকল্পনা অনুমোদন করেছেন, যেখানে স্থায়ীভাবে টোল আদায়ের ব্যবস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের কোনো জাহাজের যাতায়াত নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, এই নিয়ন্ত্রণ শুধু ইরানের রাজস্ব বৃদ্ধিই নয়, বরং সার্বভৌমত্বের একটি প্রতীক হিসাবেও বিবেচিত হচ্ছে। ইরান নিরাপদ যাতায়াতের জন্য প্রতিটি ট্যাংকার থেকে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত টোল আদায় করছে, যা দৈনিক কোটি কোটি ডলারের আয় নিশ্চিত করছে। এতে জ্বালানি বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের পরিবর্তে অন্যান্য মুদ্রার ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর ফলে চীনের প্রতি বিশেষ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক প্রভাব কমছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে ইরানের পদক্ষেপ বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেত কুপার ৪১টি দেশের এক বৈঠকে বলেন, ‘ইরান একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ দখল করে বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে।’ তিনি আরও জানান, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর পর ইরান জাহাজে ২৫টিরও বেশি আক্রমণ চালিয়েছে এবং প্রায় দুই হাজার জাহাজে ২০ হাজার নাবিক আটকা পড়েছে।
কার্নেগি গবেষক নিকোল গ্রাজিউস্কি উল্লেখ করেন, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরান এক বছরের মধ্যে তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রোগ্রাম পুনরায় সুসংগঠিত করতে পারবে। ড্রোন ও ইউএভির ক্ষেত্রে এটি আরও সহজ, কারণ এগুলো ছোট বা বেসামরিক স্থাপনাতেও তৈরি করা সম্ভব।
মারওয়ান মুয়াশার সতর্ক করে বলেন, আরব বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করার পুরোনো কৌশল এখন কার্যকর নয়। তিনি আরও জানান, ‘যদি ট্রাম্প হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে যুদ্ধ শেষ করেন, তবে অন্য কোনো রাষ্ট্র শক্তি প্রয়োগ করে এটি খোলার চেষ্টা করবে না, কারণ সেই সক্ষমতা বা সদিচ্ছা নেই।’
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের সামরিক-রাজনৈতিক কৌশল বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক ভারসাম্যের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


