আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে কুয়েতে অবস্থানরত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে গত ১ মার্চ ড্রোন হামলার ঘটনায় ছয়জন সেনা সদস্য নিহত এবং ২০ জনেরও বেশি আহত হন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) ও ঘটনাস্থল থেকে বেঁচে যাওয়া সেনা সদস্যদের বক্তব্যে উল্লেখযোগ্য ভিন্নতা দেখা দিয়েছে, যা ঘটনার পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত সেনা সদস্যদের একাধিক বিবরণে বলা হয়েছে, হামলার সময় ঘাঁটিটি পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রস্তুতিতে ছিল না এবং সেখানে অবস্থানরত ইউনিটটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে ছিল। তাদের দাবি অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর একটি লজিস্টিক ইউনিটকে এমন একটি এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছিল, যা ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সম্ভাব্য পরিসরের মধ্যে ছিল। ফলে ঘাঁটিটির অবস্থানগত ঝুঁকি আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল বলে তারা উল্লেখ করেন।
একজন আহত সেনা সদস্য জানান, হামলার আগে কিছু সময়ের জন্য সতর্কতা সংকেত সক্রিয় ছিল, তবে পরবর্তীতে “সবকিছু স্বাভাবিক” ঘোষণা করা হয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সংকেতের প্রায় ৩০ মিনিট পর ড্রোনটি ঘাঁটিতে আঘাত হানে। তিনি বলেন, হামলার মুহূর্তে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে এবং চারদিকে ধুলা ও ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, যার ফলে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়।
আরেকজন সেনা সদস্য দাবি করেন, ঘাঁটিতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত ছিল না অথবা কার্যকরভাবে সক্রিয় করা হয়নি। তিনি আরও জানান, হামলার সময় ড্রোনটির আগমন সম্পর্কে পর্যাপ্ত আগাম সতর্কতা পাওয়া যায়নি, যার ফলে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ সীমিত ছিল। এই পরিস্থিতিকে তিনি ইউনিটের প্রস্তুতির ঘাটতি হিসেবে উল্লেখ করেন।
হামলার পরবর্তী উদ্ধার ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাতেও ঘাটতির অভিযোগ করেছেন আহত সেনারা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক আহত সেনা নিজেরাই প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন এবং পরে বেসামরিক যানবাহনের সহায়তায় হাসপাতালে স্থানান্তরিত হন। ঘটনাস্থলে সংগঠিত উদ্ধার কার্যক্রম দ্রুত ও সমন্বিত ছিল না বলেও তারা দাবি করেন।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে সেনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। দপ্তরের এক কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, ঘাঁটিতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর ছিল এবং সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। তবে ড্রোনটি কীভাবে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অতিক্রম করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রস্তুতি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এবং এর মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে ড্রোন হামলার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সামরিক ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা কৌশল আরও উন্নত ও প্রযুক্তিনির্ভর করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে সেনা মোতায়েনের স্থান নির্বাচন, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া সমন্বয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এ ঘটনার পর মার্কিন সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে তথ্য প্রকাশের স্বচ্ছতা ও ঘটনাপরবর্তী মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, ঘটনার প্রকৃত চিত্র এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও তথ্য যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হয়।


