ক্রীড়া প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ফুটবলের সাম্প্রতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, ঘরোয়া কাঠামো সংস্কার, বিদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় অন্তর্ভুক্তি এবং আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়াল। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল টি-স্পোর্টসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের ফুটবলের বর্তমান অগ্রগতি, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
সাক্ষাৎকারে তাবিথ আউয়াল বলেন, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা হামজা চৌধুরীর জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্তির পর বাংলাদেশের ফুটবলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। তার মতে, বিদেশে বেড়ে ওঠা ও বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের অন্তর্ভুক্তি দলের মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তিনি জানান, শমিত সোম, ফাহামিদুলসহ আরও কয়েকজন খেলোয়াড়ের অন্তর্ভুক্তির ফলে জাতীয় দলের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বেড়েছে এবং বিভিন্ন দেশ এখন বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
বাফুফে সভাপতির ভাষায়, বর্তমানে ফিফা উইন্ডোতে বাংলাদেশের জন্য প্রতিপক্ষ দল পাওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে উঠেছে। তিনি জানান, আগামী জুনে ইউরোপের দেশ সান মারিনোর বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে ফিফা র্যাংকিংয়ে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকা ভিয়েতনামের বিপক্ষেও বাংলাদেশ দল মাঠে নেমেছিল। তার মতে, এসব আন্তর্জাতিক ম্যাচ দেশের ফুটবল উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
হামজা চৌধুরীর প্রভাব প্রসঙ্গে তাবিথ আউয়াল বলেন, এক বছর আগে জাতীয় দলের সামগ্রিক মূল্যায়নের তুলনায় এককভাবে হামজার বাজারমূল্য অনেক বেশি ছিল। তবে সময়ের ব্যবধানে স্থানীয় খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স উন্নত হয়েছে এবং দলীয় ভারসাম্য বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, বিদেশে বেড়ে ওঠা খেলোয়াড়দের পাশাপাশি স্থানীয় খেলোয়াড়রাও এখন জাতীয় দলে অবদান রাখছে, যা সামগ্রিক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়।
দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বাফুফে সভাপতি বলেন, খেলোয়াড়দের যথাযথ স্বীকৃতি না দেওয়ার প্রবণতা একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। তিনি বলেন, সংগঠকদের অতিরিক্ত প্রচার ও খেলোয়াড়দের আড়ালে রাখার সংস্কৃতি পরিবর্তন করা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ফুটবলারদের অর্জনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, খেলোয়াড়দেরই সামনে আনা উচিত এবং তাদের যথাযথ সম্মান দেওয়া রাষ্ট্র ও সংগঠনের দায়িত্ব।
কোচ নিয়োগ প্রসঙ্গে বাফুফে সভাপতি জানান, বর্তমান কোচ হ্যাভিয়ের কাবরেরার সঙ্গে চুক্তি আগামী ৩০ এপ্রিল শেষ হবে। নতুন কোচ নিয়োগে দুই বছরের জন্য উন্মুক্ত চুক্তি প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান। এ প্রক্রিয়ায় বাজেট সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি কোচের পূর্ব অভিজ্ঞতা, উন্নয়নমূলক ফলাফল এবং খেলোয়াড় উন্নয়নে ভূমিকা বিবেচনা করা হবে। তিনি আরও বলেন, কোচকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। প্রয়োজনে বর্তমান কোচ এবং পূর্ববর্তী কোচদেরও পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন ও ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তাবিথ আউয়াল বলেন, চ্যালেঞ্জকে অজুহাত হিসেবে না দেখে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে। তার মতে, শুধু দল নয়, বাফুফের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাকেও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে।
ঘরোয়া ফুটবল কাঠামো নিয়ে তিনি বলেন, দেশের লিগের মানোন্নয়ন এখন সময়ের দাবি। খেলোয়াড়দের মান, ক্লাব ব্যবস্থাপনা এবং সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি না করলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, দেশি ও বিদেশি—উভয় ধরনের খেলোয়াড়ের জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে প্রতিভা বিকাশের সুযোগ বৃদ্ধি পায়।
স্টেডিয়াম ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রসঙ্গে বাফুফে সভাপতি জানান, সরকারের সঙ্গে ছয়টি আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম নির্মাণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি ফিফা মানসম্পন্ন টেকনিক্যাল একাডেমি স্থাপনের জন্য জায়গা বরাদ্দ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের ফুটবলের প্রযুক্তিগত ঘাটতি কিছুটা হলেও পূরণ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দেশীয় ফুটবলে “সিন্ডিকেট” বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রভাব নিয়ে সমালোচনার প্রসঙ্গে তাবিথ আউয়াল বলেন, সমালোচনাকে তিনি ইতিবাচকভাবে দেখেন। তবে ব্যক্তিগত আক্রমণের পরিবর্তে গঠনমূলক সমালোচনার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, সমালোচনা খেলাধুলা নিয়ে সচেতনতা তৈরি করে এবং সংশ্লিষ্টদের আরও দায়িত্বশীল করে তোলে।
এছাড়া তিনি জানান, আন্তর্জাতিক স্কাউটিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রে স্কাউট নিয়োগের মাধ্যমে বিদেশে থাকা সম্ভাবনাময় ফুটবলারদের খুঁজে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নারী ফুটবলারদের বিষয়ে বাফুফে সভাপতি জানান, পূর্বঘোষিত বোনাস পহেলা বৈশাখে হালখাতার মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে। তিনি বলেন, নারী ফুটবলের উন্নয়নেও ফেডারেশন সমান গুরুত্ব দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এ ধারাকে আরও শক্তিশালী করা হবে।


