আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় খাদ্য সরবরাহ পরিস্থিতি ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে। দৈনিক প্রয়োজনের তুলনায় আটা সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় উপত্যকার ২৪ লাখ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতি মানবিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।
গাজার সরকারি গণমাধ্যম দপ্তরের গতকাল রবিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, উপত্যকায় দৈনিক প্রায় ৪৫০ টন আটার প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২০০ টন। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেকেরও বেশি ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা খাদ্য সহায়তা কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। বিবৃতিতে দাবি করা হয়, এই সীমিত সরবরাহের কারণে লাখ লাখ মানুষের মৌলিক খাদ্য চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী গাজায় প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক ত্রাণসামগ্রী প্রবেশের কথা থাকলেও বাস্তবে তার তুলনায় অনেক কম সহায়তা প্রবেশ করছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, বর্তমানে অনুমোদিত ত্রাণ প্রবাহ চুক্তির তুলনায় প্রায় ৩৮ শতাংশের মধ্যে সীমিত রয়েছে। এতে খাদ্য, ওষুধ এবং অন্যান্য জরুরি সহায়তার সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর কার্যক্রমেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দাতব্য সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন’ সাময়িকভাবে আটা সরবরাহ বন্ধ করেছে বলে জানা গেছে। সংস্থাটি পূর্বে দৈনিক ২০ থেকে ৩০ টন আটা সরবরাহ করত। অন্যদিকে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) তাদের আটা সরবরাহ ৩০০ টন থেকে কমিয়ে ২০০ টনে নামিয়েছে। একইসঙ্গে কয়েকটি অন্যান্য সংস্থাও নিরাপত্তা ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতার কারণে রুটি ও আটা বিতরণ কর্মসূচি স্থগিত রেখেছে।
মানবিক সহায়তা হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে গাজায় বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উপত্যকার প্রায় ২৪ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ১৯ লাখ মানুষ বর্তমানে বাস্তুচ্যুত হয়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র ও তাঁবুতে বসবাস করছেন। অবকাঠামো ধ্বংস, আবাসন সংকট এবং মৌলিক সেবার অভাবে তাদের জীবনযাত্রা অত্যন্ত অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে।
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি সত্ত্বেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি বলে বিভিন্ন পক্ষ অভিযোগ করছে। গাজার কর্তৃপক্ষের দাবি, চুক্তিতে উল্লেখিত শর্ত অনুযায়ী খাদ্য, চিকিৎসা সামগ্রী ও আশ্রয় উপকরণের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে না, ফলে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম প্রত্যাশিতভাবে অগ্রসর হচ্ছে না।
অন্যদিকে চলমান সংঘাতে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির তথ্যও পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানানো হয়, এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। পাশাপাশি গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়, যার মধ্যে আবাসিক ভবন, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য জনসেবা কাঠামো অন্তর্ভুক্ত।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, খাদ্য সরবরাহের ধারাবাহিক ঘাটতি এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা অব্যাহত থাকলে গাজার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে আটা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবনযাত্রা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে বলে তারা মনে করছেন।


