আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিশ্বব্যাপী চলমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও ধারাবাহিক ধাক্কার প্রভাবে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থানের ঘাটতি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময়ে প্রায় ১২০ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান চাহিদা পূরণ না হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকে যোগ দিতে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকরা যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে সমবেত হওয়ার প্রাক্কালে তিনি এ মন্তব্য করেন। বৈঠকটি বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ প্রবাহ এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি নীতি কাঠামো নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অজয় বাঙ্গা বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধারা অব্যাহত থাকলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হবে না। তার মতে, প্রায় ৪০ কোটি মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে, ফলে অবশিষ্ট বিপুল জনগোষ্ঠী কর্মহীনতার ঝুঁকিতে পড়বে। এই ঘাটতিকে তিনি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও জানান, কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে বিশ্ব অর্থনীতিতে একাধিক ধাক্কা লেগেছে, যার মধ্যে ধারাবাহিক ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতা অন্যতম। এসব কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিনিয়োগ পরিবেশ দুর্বল হয়েছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট বলেন, উন্নয়ন নীতিনির্ধারকদের শুধু স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে মনোযোগ দিলে চলবে না; বরং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। তার মতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্প্রসারণ, নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং অবকাঠামো উন্নয়ন—এসব বিষয় একসঙ্গে অগ্রাধিকার পাওয়া জরুরি।
তিনি উল্লেখ করেন, অনেক উন্নয়নশীল দেশে অনুমতি প্রদান প্রক্রিয়ার জটিলতা, দুর্নীতি, শ্রম ও ভূমি আইন, ব্যবসা শুরু করার প্রতিবন্ধকতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা বিনিয়োগের প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে। এসব কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না হলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাবে না।
বাঙ্গা জানান, বিশ্বব্যাংক বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে নীতিগত ও নিয়ন্ত্রক সংস্কারের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য কয়েকটি খাত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে অবকাঠামো, ক্ষুদ্র কৃষিভিত্তিক উৎপাদন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন এবং মূল্য সংযোজিত উৎপাদন খাত। এসব খাতে বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে বৈশ্বিক বাণিজ্য অস্থিরতার ওপর কম নির্ভরশীল হওয়ায় এগুলো কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পানি, বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এখনো বড় একটি চ্যালেঞ্জ। এ প্রেক্ষাপটে অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে আগামী কয়েক বছরে প্রায় এক বিলিয়ন মানুষের জন্য নিরাপদ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আফ্রিকায় প্রায় ৩০ কোটি পরিবারের বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করার উদ্যোগও চলমান রয়েছে।
অজয় বাঙ্গা বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করা না গেলে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব গুরুতর হতে পারে। তার মতে, এর ফলে বৈধ ও নিয়মিত অভিবাসনের পাশাপাশি অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন কিছু খাতে দ্রুত পরিবর্তন আনলেও অবকাঠামো, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও উৎপাদনমুখী খাতগুলো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকবে। ফলে এসব খাতে বিনিয়োগ ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট বলেন, উন্নয়ন চ্যালেঞ্জগুলো কোনো একক সংস্থা বা দেশের পক্ষে একা সমাধান করা সম্ভব নয়। এজন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং নীতিগত সংস্কারের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।


