আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনা কোনো ধরনের অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ মার্কিন ডলারের উপরে উঠে গেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অবরোধ ঘোষণার পর বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক পণ্যবাজার ও মুদ্রাবাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলেছে।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) লেনদেন শুরুর কিছুক্ষণ পরই তেলের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়। মে মাসের সরবরাহের জন্য ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৪ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে জুন মাসের সরবরাহের জন্য ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ ডলারে দাঁড়ায়। মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট নিয়ে অনিশ্চয়তা এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এর আগে যুদ্ধবিরতির পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল এবং শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। তবে ইসরায়েলের লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকা এবং হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে নতুন নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় বাজারে পুনরায় অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালীতে যেকোনো বিঘ্ন সরাসরি বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ ও দামে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এশিয়ার শেয়ারবাজারেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। দিনের শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক প্রায় ২ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেলেও পরবর্তীতে কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়। একই সময়ে জাপানের নিক্কেই সূচক ০ দশমিক ৩ শতাংশ কমে যায়। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ঝুঁকিবিমুখ মনোভাব বাড়ায় আঞ্চলিক বাজারগুলোতে চাপ সৃষ্টি হয় বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
মুদ্রাবাজারেও ডলারের শক্তিশালী অবস্থান দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডলার এশিয়ার প্রধান কয়েকটি মুদ্রার বিপরীতে শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছায়। ডলার সূচক, যা ছয়টি প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের মান পরিমাপ করে, সর্বোচ্চ ০ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৯৯ দশমিক ১৮৭-এ পৌঁছায়, যা ৭ এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ।
ইউরোর মান ০ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ১ দশমিক ১৬৬৭ ডলারে নেমে আসে। ব্রিটিশ পাউন্ড ০ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৩৩৮৩ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে অস্ট্রেলিয়ান ডলার ০ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ০ দশমিক ৭০১৪ ডলারে এবং নিউজিল্যান্ড ডলার ০ দশমিক ৭ শতাংশ কমে ০ দশমিক ৫৭৯৮ ডলারে অবস্থান করে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী নিয়ে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ওই প্রণালীতে অবরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ চেইনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে (ইস্টার্ন টাইম) ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশ ও প্রস্থানকারী সব ধরনের সামুদ্রিক যানবাহনের ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম শুরু করা হবে। এ পদক্ষেপকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি কৌশলগত ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টপ্যাক তাদের এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ফরেক্স বাজারে সীমিত লেনদেন এবং বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থান ঝুঁকিবিমুখ মনোভাবের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর ফলে ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অন্যান্য প্রধান মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে জ্বালানি তেল ও বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে আরও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।


