আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের সিকিম রাজ্যের নামচি জেলায় নির্মাণাধীন একটি সুড়ঙ্গে মিথেন গ্যাসের বিস্ফোরণ ও ভূমিধসের মর্মান্তিক ঘটনায় অন্তত সাতজন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। জাতীয় জলবিদ্যুৎ শক্তি করপোরেশনের (এনএইচপিসি) তিস্তা ষষ্ঠ ধাপ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের এই সুড়ঙ্গে দুর্ঘটনার পর মোট ২৫ জন শ্রমিক আটকা পড়েন। এর মধ্যে সাতজনের মরদেহ উদ্ধার করা হলেও বাকি ১৮ জন শ্রমিক এখনো ভেতরে অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন। তাদের জীবিত উদ্ধারের উদ্দেশ্যে বর্তমানে দ্বিতীয় দিনের মতো ব্যাপক উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, সোমবার বিকেল আনুমানিক ৩টা ৪০ মিনিটে এ দুর্ঘটনা ঘটে। প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, মাটির নিচের শিলাস্তর থেকে নিঃসরিত মিথেন গ্যাস সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকজুড়ে জমে গিয়েছিল। জমে থাকা সেই গ্যাস অপসারণের প্রক্রিয়া চলার সময়ই আকস্মিক বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় সুড়ঙ্গের একটি অংশ ধসে পড়ে এবং এর প্রধান প্রবেশপথ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ভেতরে অবস্থানরত শ্রমিকদের তাৎক্ষণিকভাবে বের হওয়ার সব পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। দুর্ঘটনার সময় অল্পসংখ্যক শ্রমিক দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হলেও একটি বড় অংশ সুড়ঙ্গের গভীরে আটকা পড়ে যায়।
নিহত ও আটকা পড়া শ্রমিকদের মধ্যে এনএইচপিসির কর্মী ও বিভিন্ন স্তরের শ্রমিকরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। দুর্ঘটনার পরপরই জেলা প্রশাসন, জাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলা বাহিনী (এনডিআরএফ), রাজ্য দুর্যোগ মোকাবেলা বাহিনী (এসডিআরএফ), সিকিম পুলিশ, অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি সেবা বিভাগসহ একাধিক বিশেষায়িত সংস্থা যৌথভাবে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। তবে উদ্ধারকাজে শুরু থেকেই তীব্র জটিলতা ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। সুড়ঙ্গের অভ্যন্তরে মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি বিপজ্জনক মাত্রায় থাকায় এবং অক্সিজেনের মারাত্মক ঘাটতি দেখা দেওয়ায় উদ্ধারকর্মীদের শ্বাসকার্য ব্যাহত হয়। এর পাশাপাশি ধসের কারণে ভেতরে দৃশ্যমানতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে এবং সুড়ঙ্গের সরু গঠন পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।
প্রাথমিক পর্যায়ে বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে কয়েকজন উদ্ধারকর্মী অসুস্থ হয়ে পড়লে অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে হয়। পরবর্তীতে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে উদ্ধার কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়। এর অংশ হিসেবে পাশের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য থেকে গ্যাস প্রতিরোধী বিশেষ সরঞ্জামসহ একটি বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি পাকিয়ং ও শিলিগুড়িভিত্তিক এনডিআরএফের দ্বিতীয় ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত সদস্য এবং স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরাও উদ্ধার অভিযানে যুক্ত হন।
সিকিম রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এবং নামচি জেলা প্রশাসনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় সারা রাত ধরে উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুড়ঙ্গের ভেতরের পরিবেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল থাকা সত্ত্বেও আটকে থাকা ১৮ জন শ্রমিককে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত অ্যাম্বুলেন্স এবং জরুরি চিকিৎসা দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে যাতে উদ্ধারকৃতদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা প্রদান করা যায়। এই দুর্ঘটনা প্রকল্প এলাকার শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সুড়ঙ্গ নির্মাণে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।


