আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি আরও এক ধাপ গুরতর রূপ ধারণ করেছে। সাময়িক বিরতির পর ইরানের বিভিন্ন কৌশলগত ও সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে সাম্প্রতিক আক্রমণের পাল্টা জবাব হিসেবে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে বলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত আমেরিকান বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা বজায় রাখতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সামরিক অবকাঠামো ও প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে এই সাম্প্রতিক আক্রমণ পরিচালনা করা হয়। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের কৌশলগত দ্বীপ কেশম, বুশেহর প্রদেশ, খুজেস্তানের আবাদান শহর, হোরমোজগান প্রদেশের তেল ও সমুদ্র বন্দরকেন্দ্রিক শহর বন্দর আব্বাস এবং আবু মুসা ও কিশ দ্বীপে একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় ইরানের সামরিক কমান্ড সেন্টার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নির্মাণ কারখানা এবং উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্রগুলোকে মূল লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে বেশ কয়েকটি স্থানে প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার খবর পাওয়া গেছে।
বর্তমান সংকটের সূচনা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল সম্মিলিতভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরু করে। প্রাথমিক পর্যায়ে সংঘাতটি স্বল্পমেয়াদী হবে বলে ধারণ করা হলেও এটি ইতোমধ্যে প্রায় ছয় মাসে গড়িয়েছে। কূটনৈতিক সমাধানের প্রচেষ্টায় অংশ হিসেবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে উভয় পক্ষ সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল এবং পরোক্ষ আলোচনা শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে গত মঙ্গলবার জর্ডানের একটি আমেরিকান সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি তেলবাহী একাধিক ট্যাংকারকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর পর পরিস্থিতি আবারও দ্রুত অবনতির দিকে যায়।
মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ নেতৃত্ব এই হামলার পর কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, শত্রুপক্ষের যেকোনো আগ্রাসী আচরণের উপযুক্ত ও সরাসরি জবাব দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের অংশ। ওয়াশিংটন থেকে জানানো হয়, বারবার কূটনৈতিক সদ্ব্যবহার ও সতর্কবার্তা সত্ত্বেও পাল্টা হামলা চালানোর কারণে এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য হয়েছে মার্কিন বাহিনী। এদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত আইন ও নিরাপত্তা নির্দেশিকা অমান্য করে ঝুঁকিপূর্ণ রুটে চলাচলের কারণেই হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানিবাহী ট্যাংকারগুলোতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। একই সাথে জর্ডানের ঘাঁটিতে আক্রমণকে তারা আত্মরক্ষামূলক ও আগ্রাসনের পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
এর একদিন আগেই মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সমীকরণে একটি অভূতপূর্ব পরিবর্তন দেখা যায়। ইরাকের ভূখণ্ডে সক্রিয় ইরান সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও মিলিশিয়া লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরব যৌথ সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। ওই যৌথ অভিযানে মিলিশিয়াদের বহু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ও অস্ত্রাগার ধ্বংস করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ সৌদি আরবের বৃহৎ তেল শোধনাগার এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ অবকাঠামোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছিল, যার প্রেক্ষাপটে এই যৌথ সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এই দ্বিমুখী ও বহুমুখী হামলার ফলে পুরো অঞ্চল জুড়ে আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা প্রকট হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে এই সামরিক সংঘাত পুনরুজ্জীবিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বিশেষ করে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে মারাত্মক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন মারাত্মক বিঘ্নিত হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও উর্ধ্বমুখী হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এশিয়ার উঠতি অর্থনীতি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো, যারা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি আমদানির ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল, তারা সম্ভাব্য সরবরাহ সংকটের মুখোমুখি হতে পারে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরণের বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকট কেবল আঞ্চলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তার ওপর গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী ছায়া ফেলছে। একদিকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার স্থবিরতা এবং অন্যদিকে সামরিক শক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার পরিস্থিতিকে ক্রমান্বয়ে আরও বেশি অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং দায়িত্বশীল উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।


