ইউরোপের তীব্র দাবদাহ ও জলবায়ু পরিবর্তন: চীনের এসি বাজারের নজিরবিহীন বিস্তার ও বাণিজ্য উত্তাপ

ইউরোপের তীব্র দাবদাহ ও জলবায়ু পরিবর্তন: চীনের এসি বাজারের নজিরবিহীন বিস্তার ও বাণিজ্য উত্তাপ

আন্তর্জাতিক অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক

ইউরোপীয় মহাদেশজুড়ে ঐতিহাসিকভাবে কৃত্রিম শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ বা এসি ব্যবহারের হার অত্যন্ত কম। ভৌগোলিক অবস্থান, স্বল্পকালীন গ্রীষ্ম, পরিবেশ সচেতনতা এবং উচ্চ বিদ্যুৎ খরচের কারণে বিশ্বজুড়ে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে এসির ব্যবহার ৯০ শতাংশ, সেখানে ইউরোপে এই হার ছিল গড়ে মাত্র ২০ শতাংশ। এছাড়া শতাব্দীর প্রাচীন স্থাপত্যরীতির কারণে বহু ইউরোপীয় ভবনে এসি স্থাপনে প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা ও কারিগরি জটিলতা বিদ্যমান। তবে সাম্প্রতিক রেকর্ডভাঙা তাপদাহ, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং প্রাণঘাতী আবহাওয়া ইউরোপীয়দের ঐতিহ্যগত জীবনযাত্রার ধারণা বদলে দিতে বাধ্য করছে। তীব্র গরমে বিপুল সংখ্যক মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও প্রাণহানির পর সেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের চাহিদা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এই চাহিদাকে মূলধন করে ইউরোপের বাজারে দ্রুত আধিপত্য বিস্তার করছে চীনা এসি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো।

ইউরোপের উদীয়মান এই বৃহৎ বাজার দখলে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে চীনের ইলেকট্রনিক্স খাতের শীর্ষ ব্র্যান্ড মিডিয়া, গ্রী এবং হায়ার। স্বল্প খরচে, দ্রুত এবং আধুনিক নকশায় পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতার কারণে তারা পশ্চিমা প্রতিযোগী কোম্পানিগুলোকে পেছনে ফেলছে। ইউরোপের প্রাচীন অবকাঠামো ও ঐতিহাসিক বাড়িগুলোর গঠনশৈলী বিবেচনায় নিয়ে চীনা প্রস্তুতকারকরা বিশেষ ধরনের ‘পোর্টেবল স্প্লিট এসি’ বাজারে এনেছে, যা সহজে বহনযোগ্য, কম শব্দ উৎপন্ন করে এবং স্থাপনে দেয়াল বা জানালা ভাঙার প্রয়োজন হয় না। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যমতে, নির্দিষ্ট কিছু মডেলের বিক্রয় আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ ছাড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠিত ইউরোপীয় ও পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলোর সক্ষমতার বিপরীতে চীনা ব্র্যান্ডগুলোর সাশ্রয়ী মূল্য ও নমনীয় সাপ্লাই চেইন একটি বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করেছে।

চীনা পণ্যের এই আগ্রাসী প্রবেশের ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা আরও প্রকট হচ্ছে। ইতিপূর্বে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীনের বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড ৩৬০ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে, যার পেছনে চীনের ইলেকট্রিক গাড়ি ও সোলার প্যানেলের ব্যাপক রপ্তানি বড় ভূমিকা রেখেছে। বর্তমান এসি বাজারের বিস্তার এই ঘাটতিকে আরও বাড়িয়ে তোলার আশঙ্কায় ফ্রান্স, জার্মানি ও বেলজিয়ামের মতো দেশগুলো তাদের দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় চীনা এসি আমদানির ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে, চীনের নীতিনির্দেশক ও বাজার বিশ্লেষকরা এই শুল্ক পরিকল্পনার কঠোর সমালোচনা করে বলছেন, কৃত্রিম বাধা তৈরি করে তীব্র দাবদাহের মতো বাস্তবিক সংকট মোকাবেলা সম্ভব নয়; বরং এটি সাধারণ ইউরোপীয় ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে তুলবে।

উৎপাদন খাতের এই নতুন মেরুকরণ চীনের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার করেছে। পোশাক, আসবাবপত্র ও গৃহস্থালি পণ্যের মতো ঐতিহ্যবাহী রপ্তানি খাত থেকে সরে গিয়ে চীন যখন বৈদ্যুতিক যান ও সবুজ প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছিল, তখন ইউরোপের এই জলবায়ু সংকট তাদের প্রথাগত গৃহস্থালি সরঞ্জাম নির্মাতাদের জন্য একটি পুনর্জাগরণের সুযোগ এনে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইউরোপে এসি ব্যবহারের এই প্রবণতা নিছক সাময়িক কোনো পরিবর্তন নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তৈরি হওয়া একটি স্থায়ী বৈশ্বিক বাজার বাস্তবতা। সুরক্ষা নীতি বা শুল্ক প্রাচীর তুলে এই চাহিদা রোধ করা রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে কঠিন হওয়ায় আগামী দিনগুলোতে ইউরোপ ও চীনের বাণিজ্য আলোচনায় এসি খাত একটি বড় নীতিগত ইস্যু হয়ে উঠতে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ