জাতীয় ডেস্ক
আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাবে দেশের অনেক নবজাতক প্রয়োজনীয় মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক মানসিক বিকাশের জন্য গুরুতর উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করছে। পরিবর্তনশীল জীবনধারা, কর্মব্যস্ততা এবং পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে শিশুর সঠিক পুষ্টি ও সুরক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নবজাতকের জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে শালদুধ পান নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজারজাত বিকল্প শিশুখাদ্যের ওপর অতিনির্ভরশীলতা কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা।
শনিবার রাজধানীর ন্যাশনাল বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান আয়োজিত ‘বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ-২০২৬’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক এই আয়োজনের এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘জীবনের সূচনায় মাতৃদুগ্ধ পান : টেকসই উদ্যোগ করি বেগবান’। বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ উপলক্ষে সারা দেশে পুষ্টি সচেতনতা ও মা-শিশুর স্বাস্থ্যের মান উন্নয়নে সপ্তাহব্যাপী নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, অতীতে পরিবারে শিশুর লালন-পালন এবং মাতৃদুগ্ধ পান নিশ্চিত করার বিষয়ে যে সচেতনতা ও গুরুত্ব ছিল, আধুনিক জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই চর্চা অনেক ক্ষেত্রে কমে এসেছে। জন্মের পরপরই শিশুকে মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে রাখা, কর্মসংস্থানগত বাধ্যবাধকতা এবং পরিবর্তিত মানসিকতার কারণে অনেক মা সন্তানকে প্রয়োজনীয় সময় মাতৃদুগ্ধ পান করাতে পারছেন না। আধুনিক জীবনধারার অনুসরণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাতৃদুগ্ধ শিশুর সর্বোত্তম ও প্রাকৃতিক খাদ্য। এটি শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি, সঠিক শারীরিক বৃদ্ধি এবং মানসিক বিকাশে মৌলিক ভূমিকা পালন করে। শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য মায়ের স্নেহ, শারীরিক স্পর্শ ও মাতৃদুগ্ধ অত্যন্ত জরুরি।
দেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের মধ্যে ছড়ানো হামসহ (মিজলস) বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ব্যাপ্তি বাড়ার পেছনে অপুষ্টি অন্যতম প্রধান কারণ। যেসব শিশু প্রয়োজনীয় মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত হয়, তাদের প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তারা সহজেই জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। মাতৃদুগ্ধ পানের হার বাড়ানো গেলে শিশুদের সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে প্রক্রিয়াজাত ফাস্টফুড গ্রহণ ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বন্ধ করার তাগিদ দিয়ে শিশুখাদ্য হিসেবে কৌটাজাত বিকল্প পণ্যের ব্যবহার কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
স্বাস্থ্য খাতের পলিসি তুলে ধরে বলা হয়, সচেতনতামূলক উদ্যোগ কেবল বিশেষ কোনো সপ্তাহে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। সারা বছরব্যাপী জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এ জন্য জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, সিভিল সার্জন, জেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে (প্রিভেনটিভ হেলথকেয়ার) দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার মূলধারায় রূপ দিতে সুস্থ, সক্ষম ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জানান, মাতৃদুগ্ধ পান করানোর হারের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের তুলনায় অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থানে থাকলেও কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যগত সুফল নিশ্চিত করতে এখনও বড় ধরনের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। মায়েদের স্বাস্থ্যগত উপকারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিয়মিত ও সঠিকভাবে মাতৃদুগ্ধ পান করালে মায়েদের স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এই বার্তা দেশের সর্বস্তরে পৌঁছে দিতে পরিবার, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং গণমাধ্যমকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত এ সভায় অন্যান্যের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. জিন্নাত রেহানা এবং জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইউনূস আলী উপস্থিত থেকে মাতৃদুগ্ধ পানের গুরুত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক করণীয় নিয়ে বক্তব্য প্রদান করেন।


