আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও লোহিত সাগর কেন্দ্রিক নিরাপত্তা সংকট বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবসাকে গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক হুমকি, ইরানের পাল্টাপাল্টি অবস্থান এবং মিসরের দামিয়েত্তা বন্দরে ড্রোন হামলার পর সুয়েজ খাল ও বাব আল-মানদেব প্রণালি ঘিরে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ ব্যাহত হওয়া, জাহাজ চলাচল ধীরগতি হওয়া এবং পরিবহন ও বিমা খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ট্যাংকারের রুট পরিবর্তন ও শনাক্তকরণ বন্ধের প্রবণতা
লোহিত সাগরে তেলবোঝাই ট্যাংকারগুলোর সুয়েজ খালের দিকে যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদি আরবের তেল পরিবহনে হুতিদের হুমকির পর উত্তরমুখী এই বিকল্প রুট ব্যবহারের গতি বেড়েছে। অন্যদিকে, বাব আল-মানদেব হয়ে এশিয়ামুখী দক্ষিণমুখী রুটে তেলের প্রবাহ অর্ধেকেরও বেশি নেমে এসেছে। সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে আসা তেলবাহী জাহাজের বড় অংশই এখন দক্ষিণমুখী পথ এড়িয়ে সুয়েজ খালের দিকে চালিত হচ্ছে।
হামলা ও নজরদারির ঝুঁকি এড়াতে অনেক ট্যাংকার তাদের অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) বা অবস্থান শনাক্তকারী ট্র্যাকার বন্ধ রেখে চলাচল করছে। বিশেষ করে দক্ষিণমুখী ঝুঁকিপূর্ণ রুটগুলোতে এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে কিছু চীনা মালিকানাধীন ট্যাংকার হুতিদের বিশেষ প্রশাসনিক অনুমতি নিয়ে ওই পথ ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সামরিক চাপের মুখমুখী অবস্থান
মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান শক্তিগুলো জ্বালানি রুটকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের কোনো তেলবাহী ট্যাংকার আটক করলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হবে।
অন্যদিকে, হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের সব ধরনের সামুদ্রিক জাহাজের ওপর অবরোধের ডাক দিয়েছে, যা ইয়ানবু বন্দর থেকে ভূমধ্যসাগরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া ট্যাংকারগুলোকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। হুতিদের ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় সুয়েজ খাল অঞ্চল চলে এলেও ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে এসব হামলা প্রতিরক্ষার সুযোগ তুলনামূলক বেশি।
বিমা ব্যয় ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার সাময়িক পরিস্থিতি
সামুদ্রিক বন্দরগুলোতে হামলার পর সুয়েজমুখী জাহাজের জন্য যুদ্ধঝুঁকির বিমা প্রিমিয়াম (ওয়ার রিস্ক প্রিমিয়াম) বৃদ্ধির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। শিপিং কোম্পানিগুলো সুয়েজ খালের নিকটবর্তী মিসরীয় বন্দরগুলোতে অবস্থানরত জাহাজের নিরাপত্তা পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বন্দর সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সুয়েজ খাল এলাকা সার্বক্ষণিক কঠোর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার অধীনে পরিচালিত হওয়ায় খালটি তাৎক্ষণিকভাবে সরাসরি অচলাবস্থার মুখে পড়েনি।
পরিবহন সময়, অতিরিক্ত ব্যয় ও বৈশ্বিক বাজারের প্রভাব
বিকল্প রুট ব্যবহারে বিশ্ববাজারে তেল পৌঁছানোর প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে। এশিয়ার পরিশোধনাগারগুলো মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু বাব আল-মানদেবের পরিবর্তে সুয়েজ খাল হয়ে উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছাতে জাহাজের দ্বিগুণেরও বেশি সময় অর্থাৎ প্রায় এক মাস অতিরিক্ত সময় লাগছে।
তদ্ব্যতীত, বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলবাহী ট্যাংকারগুলো (ভিএলসিসি) পূর্ণ লোড অবস্থায় সুয়েজ খাল অতিক্রম করতে পারে না। গভীর ড্রাফটের সীমাবদ্ধতার কারণে জাহাজগুলোকে প্রথমে ‘সুমেদ’ পাইপলাইনের মাধ্যমে আংশিক তেল খালাস করতে হয় এবং পরবর্তীতে ভূমধ্যসাগরে তা পুনরায় লোড করতে হয়, যা সামগ্রিক পরিচালন ব্যয় বাড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সুয়েজ বা লোহিত সাগর অঞ্চলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে শিপিং বিমা ও ফ্রেইট চার্জ বৃদ্ধি পাবে। সমুদ্রযাত্রার সময় বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত পরিবহন খরচের সুদূরপ্রসারী প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম একযোগে বেড়ে গিয়ে ভোক্তা পর্যায়ে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে তরান্বিত করতে পারে।


