আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন সামরিক হামলাকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি ফোনে কথা বলেছেন সৌদি আরবের যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান। ফোনালাপে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বৃহৎ সামরিক অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে ওয়াশিংটনকে যেকোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত থাকার এবং উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার তাগিদ দিয়েছেন সৌদি যুবরাজ।
কূটনৈতিক ও সামরিক সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে এই ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে মধ্যপ্রাচ্যের সর্বশেষ নিরাপত্তা পরিস্থিতির সামগ্রিক পর্যালোচনা করা হয়। আলাপকালে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে মার্কিন প্রশাসনের কাছে তাদের পরবর্তী সামরিক কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য চাওয়া হয়। সৌদি আরব স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো সংঘাত বা ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর আক্রমণ পুরো অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে চরম হুমকির মুখে ফেলবে। বিশেষ করে, ইরানের ওপর সামরিক আঘাত এলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মূল অবকাঠামোগুলো পাল্টা আক্রমণের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এসব ঝুঁকি এড়াতেই মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্টকে পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে শান্ত হওয়ার এবং সামরিক পদক্ষেপ বাতিল করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সামরিক সতর্কবার্তা দেওয়ার পর থেকেই পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসগুলো আমেরিকান নাগরিকদের সম্ভাব্য ‘অপ্রত্যাশিত উত্তেজনা বৃদ্ধি’ এবং ভ্রমণ জটিলতা সম্পর্কে সচেতন থাকার জন্য বিশেষ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অবস্থান প্রকাশের পর পুরো অঞ্চল জুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর অবস্থানের বিপরীতে তেহরানও তাদের প্রতিক্রিয়া জোরদার করেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কূটনৈতিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি তুরস্ক, পাকিস্তান এবং সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে পৃথকভাবে ফোনালাপ পরিচালনা করেছেন। এসব আলোচনায় ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সোজাসাপ্টা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরায়েলের তরফ থেকে কোনো ধরনের আগ্রাসন চালানো হলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী তার সুনির্দিষ্ট, কঠোর এবং আনুপাতিক উত্তর দেবে। এ ছাড়া আঞ্চলিক কোনো ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা পুরো অঞ্চলের জন্য ভয়াবহ বার্তা বহন করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমানে ওমান ও কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর মাধ্যমে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা কমানো এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে অপ্রকাশ্য কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। কূটনৈতিক চাপের মুখে মার্কিন পক্ষ থেকেও পরবর্তীতে সামরিক পদক্ষেপ ঝুলিয়ে রেখে একটি দ্রুত চুক্তিতে পৌঁছানোর ইঙ্গিত দেখা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক নীতির এই পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রিয়াদ বর্তমানে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের কৌশলগত মিত্র হওয়া সত্ত্বেও সরাসরি সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করছে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো ধরনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হলে তেল রপ্তানি ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের সামরিক পরিকল্পনায় বাধা দিয়ে রিয়াদ মূলত আঞ্চলিক সুরক্ষা, নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্য ও নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছে। সামগ্রিকভাবে, সৌদি আরবের এই শান্তিকামী কূটনৈতিক ভূমিকা ও ইরানের পাল্টা জবাবের হুঙ্কার মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক মোড় এনে দিয়েছে, যা বিশ্ব বাজার ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।


