স্বাস্থ্য ডেস্ক
দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে আরও ছয়জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত সন্দেহে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৭৩৩ জন রোগী নিবন্ধিত হয়েছেন এবং অন্তত ৮৫ জনের দেহে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো এক বিশেষ প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই সার্বিক হালনাগাদ পরিস্থিতি জানানো হয়। বর্তমানে ভাইরাসজনিত এই মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগের সার্বিক চিত্র দেশের শিশুমৃত্যুর হার ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে সারাদেশে সন্দেহভাজন হামরোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৬৩৮ জনে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরিতে বৈজ্ঞানিক উপায়ে পরীক্ষা করে ১৬ হাজার ৭৪০ জন রোগীর দেহে নিশ্চিতভাবে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে। উল্লিখিত সময়ে হামের লক্ষণ নিয়ে দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়ে সেবা গ্রহণ করেছেন ১ লাখ ১৫ হাজার৮৭৯ জন। আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় নিবিড় নজরদারির ফলে ইতোমধ্যে ১ লাখ ১১ হাজার ৫৮৭ জন রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।
তবে প্রাণহানির হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রোগের লক্ষণ নিয়ে শিশুদের অকালমৃত্যুর হার এখনো আশঙ্কাজনক পর্যায়ে রয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে সারাদেশে হাম সন্দেহে মোট ৭৬৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়ে হামজনিত কারণে প্রাণ হারিয়েছে ৯৬ জন শিশু। স্বস্তির বিষয় হলো, গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। চিকিৎসকদের মতে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে সঠিক সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থাকা, অপর্যাপ্ত পুষ্টি এবং পারিবারিক সচেতনতার অভাব শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়িয়ে তুলছে।
হাম বা মিজেলস মূলত প্যারামিক্সোভাইরাস পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা বায়ুবাহিত কণার মাধ্যমে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশির দরুন অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায়। রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে শিশুদের শরীরে তীব্র জ্বর, চোখ লাল হওয়া, নাক দিয়ে পানি পড়া, লাগাতার কাশি এবং পরবর্তী সময়ে শরীরজুড়ে লালচে র্যাশ বা দানা দেখা দেয়। আক্রান্ত শিশু যদি পুষ্টিহীনতায় ভোগে কিংবা সময়মতো সঠিক ও দ্রুত চিকিৎসাসেবা না পায়, তবে সাধারণ হাম জটিল আকার ধারণ করে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, তীব্র পুষ্টিহীনতা, মস্তিষ্কের সংক্রমণ (এনকেফালাইটিস) এবং দৃষ্টিশক্তি হারানোর মতো মারাত্মক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি ডেকে আনে। ৯ মাস থেকে শুরু করে ৫ বছর বয়সী শিশুরা এই ভাইরাসের মূল লক্ষ্যবস্তু বা চরম ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে।
বিদ্যমান ঝুঁকি কমানো এবং প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে স্বাস্থ্য বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার দিকে বিশেষ নজর দিয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সংক্রামক ব্যাধি কর্মকর্তাদের মতে, জাতীয় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) নিয়মানুযায়ী শিশুকে নির্ধারিত সময়সূচি মেনে হাম ও রুবেলার প্রতিষেধক (এমআর টিকা) দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। যেসব প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় টিকা দেওয়ার হার কম, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিপূরক টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনার জন্য জোর তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিয়েছেন, শিশুর শরীরে হামের লক্ষণ দেখা দিলে তাকে অবিলম্বে সুস্থ শিশুদের থেকে আলাদা রাখতে হবে, পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টিকর খাবার পরিবেশন করতে হবে এবং অবস্থার অবক্ষয় এড়াতে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে শুধু চিকিৎসা প্রদানই যথেষ্ট নয়, বরং শতভাগ টিকাদানের কাভারেজ সুনিশ্চিত করা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সতর্ক রাখাই সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। বর্তমানে দেশের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় টিকাদান কর্মসূচিকে বেগবান না করা গেলে হামের এই প্রাদুর্ভাব দীর্ঘায়িত হতে পারে, যা দেশের সার্বিক শিশুমৃত্যু হ্রাসের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রাকে মারাত্মক প্রতিকূলতার মুখে ফেলবে।


