অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকা সত্ত্বেও প্রায় ৬২ শতাংশ নিবন্ধিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। দফায় দফায় সময়সীমা বাড়িয়ে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সুযোগ দেওয়া সত্ত্বেও নিবন্ধিত করদাতাদের বড় একটি অংশের মধ্যে কর-অনুগত্যের এই চরম ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে। কোভিড-১৯ মহামারি পরবর্তী ২০২০-২১ অর্থবছর বাদ দিলে, রিটার্ন দাখিলের এই হার গত এক দশকের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে টিআইএনধারী গ্রাহকের সংখ্যা ১ কোটি ৩০ লাখ হলেও সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে আয়কর রিটার্ন জমা পড়েছে মাত্র ৪৯ লাখ ৫৫ হাজার। এটি মোট নিবন্ধিত টিআইএনধারীর মাত্র ৩৮ শতাংশ। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ কোটি ২৮ লাখ টিআইএনধারীর মধ্যে রিটার্ন দাখিল করেছিলেন প্রায় ৪৫ লাখ করদাতা। পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এক বছরের ব্যবধানে করদাতার সংখ্যা সামান্য বাড়লেও কর পরিশোধ ও রিটার্ন জমায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।
ব্যক্তিপর্যায়ের পাশাপাশি কর্পোরেট খাতের চিত্রেও স্থবিরতা দেখা গেছে। দেশে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার কর্পোরেট টিআইএনধারী থাকলেও বিদায়ী অর্থবছরে মাত্র ৪২ হাজার প্রতিষ্ঠান রিটার্ন জমা দিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই সংখ্যাটি ছিল ৩৯ হাজার ৬৫৯।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক হিসাব খোলা, সঞ্চয়পত্র ক্রয় বা জমি রেজিস্ট্রেশনের মতো ৪৫টিরও বেশি সেবার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক হওয়ায় অনেকে সাময়িক প্রয়োজনে নিবন্ধিত হচ্ছেন। তবে করমুক্ত সীমার নিচে আয় থাকা এবং তদারকির অভাবে তারা পরবর্তীতে আর রিটার্ন জমা দিচ্ছেন না। পাশাপাশি রাজস্ব ব্যবস্থার জটিলতা ও নির্দেশনার অভাবও করদাতাদের অনাগ্রহের অন্যতম কারণ। বর্তমানে বাণিজ্য লাইসেন্স নবায়ন, ব্যাংক ঋণ ও এলসি খোলার ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র যাচাই কঠোর করার পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদেরা।
রিটার্ন জমার সার্বিক চিত্রে উদ্বেগ থাকলেও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে এনবিআর ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয়কর খাত থেকে ১ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা আদায় হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের ১ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার তুলনায় ১৩.০২ শতাংশ বেশি।
বিদায়ী অর্থবছরে আমদানি ও রপ্তানি শুল্ক খাত থেকে আয় হয়েছে ১ লাখ ১২ লাখ ১১৯ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছর অর্জিত হয়েছিল ১ লাখ ৯৮ কোটি টাকা; অর্থাৎ এ খাতে প্রবৃদ্ধি ১১.৯০ শতাংশ। অন্যদিকে রাজস্ব আহরণের অন্যতম প্রধান উৎস মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) খাত থেকে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা, যা গত বছরের ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকার চেয়ে ১১.৮০ শতাংশ বেশি।
সব খাত মিলিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মোট ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকার রাজস্ব সংগ্রহ করেছে। পূর্ববর্তী অর্থবছরের ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকার তুলনায় সার্বিক রাজস্ব আদায়ে ১২.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে।
তবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও সংশোধিত বাজেটের নির্ধারিত ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে রাজস্ব বোর্ড। অর্থবছর শেষে এনবিআরের মোট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর ও অনলাইন রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়া সহজীকরণের মাধ্যমে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জোর দিচ্ছে এনবিআর।


