জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। আর্থিক জালিয়াতি ও একাডেমিক তথ্যে জালিয়াতির অভিযোগে ডাব্লিউএইচওর তদন্ত চলার মধ্যেই তিনি এই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ডাব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন সায়মা ওয়াজেদ। পদত্যাগপত্রটি পর্যালোচনা করে এই খবর নিশ্চিত করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে চীন ভ্রমণে আর্থিক অনিয়ম এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ জালিয়াতির অভিযোগ তদন্ত করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সায়মা ওয়াজেদ।
২০২৩ সালের নভেম্বরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ভোটে এই পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন সায়মা ওয়াজেদ। পরের বছর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ বছরের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক পদের দায়িত্ব নেন তিনি।
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির তদন্ত শুরু হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই অনুসন্ধান শুরু করার এক পর্যায়ে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সায়মা ওয়াজেদকে প্রথম অবৈতনিক ছুটিতে পাঠায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বুধবার পর্যন্ত তিনি অবৈতনিক ছুটিতেই ছিলেন।
চলতি বছরের ৩ জুলাই এক চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, চীন সফরের সঙ্গে সম্পর্কিত আর্থিক প্রতারণা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ এনেছে ডব্লিউএইচও।
সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগপত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে একটি জমির প্লট অবৈধভাবে অধিগ্রহণের অভিযোগ করেছে ডব্লিউএইচও। তবে সায়মা ওয়াজেদ বলেছেন, ডব্লিউএইচওতে যোগ দেওয়ার আগেই তিনি ওই জমি অধিগ্রহণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য একটি আইনের আওতায় তিনি ওই জমির অধিকারী ছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন।
তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুসের কাছে পাঠানো পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ লিখেছেন, আমি আমার অঞ্চলের দেশগুলোর সেবা করার জন্য আঞ্চলিক পরিচালক পদে নির্বাচিত হয়েছিলাম, যা আমি আন্তরিকতার সঙ্গে করে এসেছি।
পদত্যাগপত্রে আরও লিখেছেন, যেহেতু আপনি দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করতে আমাকে বাধা দিয়ে চলেছেন, তাই ডব্লিউএইচতে আপনার নেতৃত্বের ওপর আমার সব আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে গেছে। এ ছাড়া, আপনার বেতন ছাড়া ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তের পর প্রায় এক বছর কোনো পারিশ্রমিক না পাওয়ায় আমার আর্থিক পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে আমি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
সায়মা ওয়াজেদ এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে ডব্লিউএইচও তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। গত মাসে সংস্থাটি জানিয়েছিল, সায়মা ওয়াজেদ ছুটিতে আছেন। তবে গোপনীয়তা বজায় রাখার স্বার্থে তার বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল সংস্থাটি।
এর আগে জুলাইয়ে ডব্লিউএইচওকে দেওয়া এক চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদ ভ্রমণসংক্রান্ত আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার আইনজীবীদের মাধ্যমে দেওয়া ওই চিঠিতে বলা হয়, নিয়মিত ভ্রমণ খরচ ফেরত পাওয়ার আবেদন প্রক্রিয়া করতে গিয়ে একজন সহকারীর প্রশাসনিক ভুলের কারণে বিষয়টি ঘটেছে। অর্থের পরিমাণ ছিল ৯০১ ডলার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ১২ অক্টোবর ওই পদের জন্য মনোনয়ন ঘোষণা করা হবে। এরপর ডিসেম্বরে আবেদন যাচাই–বাছাই শেষে আগামী ২৪ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালকেরা বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী স্বাস্থ্য নীতি নির্ধারক হিসেবে বিবেচিত হন। রোগের প্রাদুর্ভাব ও জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়া এবং স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডব্লিউএইচওর নীতি বাস্তবায়ন তাদের অন্যতম দায়িত্ব।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সদস্যদেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারত আছে। সদস্যদেশগুলো প্রতি পাঁচ বছর পর আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচন করে।

