২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের পর এই প্রথমবারের মতো দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বলে ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো দ্য ডেইলি স্টারকে নিশ্চিত করেছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অক্টোবরের শেষদিকে এ বৈঠকের প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে, দুর্গাপূজার কারণে ভারত চেয়েছে নভেম্বরের শুরুতে।
সংলাপে প্রত্যর্পণের বিষয়টি উত্থাপন করা হবে বলে কূটনৈতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা একটি কূটনৈতিক নোট দিয়ে হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছিল। এরপর ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর আবার একই অনুরোধ করা হয়েছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা ডেইলি স্টারকে জানান, আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সংলাপের আগে দুই দেশ বেশ কিছু দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবে। সপ্তাহখানেক আগে এমন একটি বাণিজ্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, 'কনস্যুলার পর্যায়ের বৈঠকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া রাজনীতিবিদদের প্রত্যর্পণ চাইবে ঢাকা। তাদের মধ্যে আছেন শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং শরীফ ওসমান বিন হাদীর হত্যাকারীরা।'
গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন হাসিনা। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার ও কামালের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।
ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, হাসিনাকে ফেরত পাঠানো হবে কি না, তার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ভারত সরকার নয় বরং দেশটির আদালত নেবেন। তবে, আদালতকে নিশ্চিত হতে হবে যে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো ভারতীয় আইনেও অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত কি না।
প্রত্যর্পণ আইনে ভারতে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচারিক তদন্তের বিধান রয়েছে। যদি কোনো ম্যাজিস্ট্রেট প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পান, তবে প্রত্যর্পণের সুপারিশ করা হতে পারে। তা না হলে অভিযোগ থেকে মুক্তি দেওয়া হতে পারে।
২০১৩ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি হয়। হাসিনাসহ অন্যান্যদের প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশের পাঠানো কূটনৈতিক অনুরোধের সঙ্গে ওই চুক্তিতে উল্লেখ থাকা প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।
চুক্তিতে বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডপ্রাপ্তদের হস্তান্তরের বিধান রয়েছে। তবে কিছু রাজনৈতিক অভিযোগকে এর আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।
যদিও হত্যা, হামলা, হত্যায় প্ররোচনা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর অভিযোগকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
২০১৭ সালে দুই দেশের মধ্যে প্রথম কনস্যুলার সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে সাধারণত কনস্যুলার সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়, ভিসা প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক আইনি সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়। জুলাই অভ্যুত্থানের আগে ২০২৪ সালের মে মাসে নয়াদিল্লিতে সবশেষ এমন সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আসন্ন বৈঠকে সীমান্ত, ভারত থেকে পুশ-ইন, ভিসা, আটক নাগরিকদের প্রত্যাবাসন, আটক জেলেদের মুক্তি, পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি, প্রত্যর্পণ ও সংশোধিত ভ্রমণ চুক্তি নবায়নের বিষয়গুলো আলোচনায় থাকবে। ২০২৩ সালে মেয়াদ শেষ হয় ভ্রমণ চুক্তির। এরপর থেকে প্রতি ছয় মাস পর পর এর মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে।
সংলাপে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা পাসপোর্ট ও ভিসা বিভাগের যুগ্ম সচিব এশা শ্রীবাস্তব এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া অনুবিভাগের মহাপরিচালক শাহ আসিফ রহমান নিজ নিজ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের পর ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশ-ইনের ঘটনাগুলো তুলে ধরবে ঢাকা।
এদিকে ভারতের অভিযোগ, নয়াদিল্লির দেওয়া আটক বাংলাদেশিদের তালিকা হস্তান্তর করা হলেও ঢাকা এখনো তাদের ফিরিয়ে নেয়নি।
ওই কর্মকর্তা বলেন, তালিকায় একই নাম বারবার এসেছে বা অনেকের পর্যাপ্ত তথ্য নেই। এ কারণে প্রস্তাবিত নামগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে যায়। যাদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে, বাংলাদেশ তাদের ফিরিয়ে এনেছে।
'বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন কারাগারে ১ হাজার ৪৪৮ বাংলাদেশি সাজা ভোগ করছেন। বিদেশে অবৈধভাবে বসবাসরত বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনা সরকারের নীতির মধ্যেই আছে,' বলেন তিনি।
বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনের কনস্যুলার উইং সূত্র জানায়, বাংলাদেশের কারাগারে সাজা মেয়াদ শেষ করা ২৫ জনের প্রত্যাবাসন চাইছে ভারত। তাদের পরিচয় ইতোমধ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
যদিও, কারাগারে সাজা ভোগ করা ১২১ ভারতীয় নাগরিকের তালিকা দিল্লিকে দিয়েছিল ঢাকা। কিন্তু হাইকমিশন জানিয়েছে, পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে অনেকের পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে হাইকমিশন কনস্যুলার সুবিধা চেয়েছে এবং ঢাকার জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তথ্য সরবরাহ করা হলেও নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে বলে হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে।
জেলেদের প্রত্যাবাসন ভারতের আরেকটি অগ্রাধিকারমূলক বিষয়। ভারতীয় হাইকমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, প্রক্রিয়াটি দ্রুত করতে নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে ঢাকার সঙ্গে একটি খসড়া প্রটোকল শেয়ার করা হয়েছে।
হাইকমিশনের ওই কর্মকর্তা বলেন, 'মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা চাই এই জেলেদের যত দ্রুত সম্ভব ফেরত পাঠানো হোক। সমুদ্রে দৃশ্যমান কোনো সীমান্ত নেই এবং তারা প্রায়ই ভুল করে সীমান্ত অতিক্রম করে ফেলে। অল্প সময় আটক থাকলেও তা তাদের জীবিকায় প্রভাব ফেলে।'

