ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর স্বাধীনতার সূচকে ৩৮ দেশের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়েছে বাংলাদেশ: ফ্রিডম হাউস

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গণতন্ত্র পর্যবেক্ষণ সংস্থা ফ্রিডম হাউসের আজ (২২ অক্টোবর) প্রকাশিত 'ফ্রিডম অন দ্য নেট ২০২৬' প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্টারনেটের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে মূল্যায়ন করা ৩৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি উন্নতি করেছে।

তবে বাংলাদেশ এখনো 'আংশিক স্বাধীন' শ্রেণিতে রয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে দেশটি এই শ্রেণিতে রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারও আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন দমনের চেষ্টা করেছে। এ ক্ষেত্রে কোনো কোনো সময় আগের সরকারের মতোই দমনমূলক কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই গণতন্ত্র পর্যবেক্ষণ সংস্থার বার্ষিক গবেষণার ১৫তম সংস্করণে বাংলাদেশের ইন্টারনেট স্বাধীনতার স্কোর পাঁচ পয়েন্ট বেড়ে ১০০-এর মধ্যে ৫০ হয়েছে। এই গবেষণায় ২০২৫ সালের ১ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত সময়ের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হয়েছে।

ফ্রিডম হাউস বলেছে, 'টানা দ্বিতীয় বছরের মতো ইন্টারনেটের স্বাধীনতায় সবচেয়ে বেশি উন্নতি করেছে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার অপসারণের পর দেশটিতে বিভিন্ন সংস্কার করা হয়েছে। তার এক দশকের শাসনামলে ব্যাপক সেন্সরশিপ ও নজরদারির চর্চা ছিল।'

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের পর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে পুরো এক বছরে কোনো ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা ঘটেনি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার পরিস্থিতির সঙ্গে এটি স্পষ্ট বৈপরীত্য তুলে ধরে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'বাংলাদেশের এই উন্নতি দেখায়, ব্যাপক গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে ডিজিটাল মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দমন-পীড়নের চর্চা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। তবে দেশটির নতুন সরকারের অধীনে গণতান্ত্রিক উত্তরণ টেকসই করার ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ রয়েছে।'

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) অধ্যাদেশে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক বন্ধের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে আইনের চূড়ান্ত পাঠ প্রকাশ করা হয়নি। আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়াটিও ছিল তাড়াহুড়াপূর্ণ ও অস্বচ্ছ।

তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়নি। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ২৮০ জনের বেশি সাংবাদিকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ আনা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে অনলাইন সংবাদমাধ্যমে কাজ করেন এমন সাংবাদিকও রয়েছেন। এসব মামলার বেশির ভাগই ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব সংবাদকে আওয়ামী লীগের প্রতি অতিরিক্ত ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।'

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অনলাইনে উসকানিমূলক প্রচার কীভাবে বাস্তব জগতে সহিংসতায় ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলার ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া গুজবে সংবাদপত্র দুটিকে ভারতপন্থী বলে অভিযুক্ত করার পর এসব হামলা হয়েছিল।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান

ফ্রিডম হাউস তিনটি ক্ষেত্রে ২১টি সূচকের মাধ্যমে ইন্টারনেটের স্বাধীনতা মূল্যায়ন করে। ক্ষেত্রগুলো হলো—ইন্টারনেটে প্রবেশের বাধা, অনলাইন বিষয়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবহারকারীর অধিকার লঙ্ঘন।

বাংলাদেশের স্কোর পাঁচ পয়েন্ট বেড়েছে। এর প্রধান কারণ, ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা না থাকা। ফলে ইন্টারনেটে প্রবেশের বাধা-সংক্রান্ত ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্কোর আগের বছরের ২৫-এর মধ্যে ১২ থেকে বেড়ে ১৬ হয়েছে।

অনলাইন বিষয়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্কোর সামান্য বেড়েছে। আগের বছর ৩৫-এর মধ্যে এই স্কোর ছিল ২০। এবার তা বেড়ে ২১ হয়েছে।

অন্যদিকে, ব্যবহারকারীর অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্কোর অপরিবর্তিত রয়েছে। ৪০-এর মধ্যে এই স্কোর ১৩। দেশটির তিনটি ক্ষেত্রের মধ্যে এটিই সবচেয়ে দুর্বল।

ফ্রিডম হাউসের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, ৭০ থেকে ১০০ স্কোর পাওয়া দেশগুলো 'স্বাধীন', ৪০ থেকে ৬৯ স্কোর পাওয়া দেশগুলো 'আংশিক স্বাধীন' এবং শূন্য থেকে ৩৯ স্কোর পাওয়া দেশগুলো 'স্বাধীন নয়' হিসেবে বিবেচিত হয়। এই শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখনো 'আংশিক স্বাধীন'।

চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত ফ্রিডম হাউসের 'ফ্রিডম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড' সূচকেও বাংলাদেশকে 'আংশিক স্বাধীন' হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছিল।

গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ মাত্র দুই বছর 'স্বাধীন' হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এক বছর দেশটিকে 'স্বাধীন নয়' শ্রেণিতে রাখা হয়েছিল। বাকি সব বছর বাংলাদেশ 'আংশিক স্বাধীন' শ্রেণিতে ছিল।

টানা ১৬ বছর ধরে বিশ্বে ইন্টারনেটের স্বাধীনতার অবনতি

ফ্রিডম হাউসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে টানা ১৬ বছর ধরে ইন্টারনেটের স্বাধীনতা কমছে। মূল্যায়ন করা ৩৮টি দেশের মধ্যে ১৬টিতে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। আটটি দেশে উন্নতি হয়েছে।

ইরানে ইন্টারনেটের স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় অবনতি হয়েছে। অন্যদিকে, চীন ও মিয়ানমারে অনলাইন পরিবেশ এখনো সবচেয়ে দমনমূলক পরিবেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। ইন্টারনেটের স্বাধীনতার দিক থেকে এস্তোনিয়া সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে।

ফ্রিডম হাউসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেমি ফ্লাই বলেছেন, কর্তৃত্ববাদী শক্তিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণে ব্যবহার করছে। এসব হুমকি মোকাবিলায় তিনি অধিকারকর্মীদের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রতিবেদনটির লেখক ও ফ্রিডম হাউসের গবেষণা বিভাগের উপপরিচালক কিয়ান ভেস্তেইনসন বলেছেন, অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্টারনেট নিশ্চিত করার লড়াইয়ে গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে নেতৃত্ব দিতে হবে।

এবারের সংস্করণে ফ্রিডম হাউস ৩৪টি দেশের ওপর মূল্যায়ন স্থগিত রেখেছে। মূল্যায়ন করা ৩৮টি দেশ নির্বাচন করা হয়েছে বিভিন্ন অঞ্চল, রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন ধরনকে প্রতিনিধিত্ব করার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে।

While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.

জাতীয়