অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ক ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ এগিয়ে নিতে একমত ঢাকা-টোকিও

অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ক 'বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট' (বিগ-বি) উদ্যোগকে 'বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি' বা অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিগ-বি নামে এগিয়ে নিতে একমত হয়েছে ঢাকা ও টোকিও।

মঙ্গলবার টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় 'কানতেই'-এ দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর যৌথ ঘোষণায় এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

এছাড়াও যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন, অর্থাৎ প্রায় ৬ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্য নিয়েছে জাপান। এর ফলে ২ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এই উদ্যোগের আওতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বিতভাবে কাজ করবে দুই দেশ।

এর মাধ্যমে শিল্পের মূল্য সংযোজন ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গড়ে তোলা, বাণিজ্য ও পণ্য সরবরাহের প্রবেশদ্বার হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলা এবং প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি বাড়ানো হবে।

এই উদ্যোগের চারটি অগ্রাধিকার হলো: যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন; প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নীতিমালা প্রণয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব উৎসাহিত করা এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সহযোগিতা সম্প্রসারণ।

এ কাঠামোর আওতায় দুই দেশ মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী এলাকাকে একটি বৃহৎ লজিস্টিকস, জ্বালানি ও শিল্পকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে দু'দেশ একসঙ্গে কাজ করবে।

দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রতিটি দেশের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অক্ষুণ্ন রাখার গুরুত্বের ওপর জোর দেন এ দুই নেতা।

তৃতীয় টার্মিনাল, এমআরটি ও বন্দর যোগাযোগ

আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নিতে একমত হয়েছেন।

তারা ঢাকায় এমআরটি লাইনগুলোর নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনাসহ ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনার কথাও বলেছেন।

আঞ্চলিক যোগাযোগ জোরদার ও দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন দুই নেতা।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে তারেক রহমানের সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি আগামী পাঁচ বছরে জাপানের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাকে স্বাগত জানান।

উৎপাদন, খাদ্য ও কৃষি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং ওষুধশিল্পে পরিপূরক ও টেকসই সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে দুই নেতা একমত হন।

তাকাইচি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। জবাবে তারেক রহমান সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো তুলে ধরেন। তিনি উন্নত নীতিমালা, স্বচ্ছতা ও সম্ভাব্যতা যাচাই করে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার অঙ্গীকার করেন।

করব্যবস্থা, শুল্ক ছাড়করণ, অর্থ প্রেরণ এবং লাইসেন্স প্রদানসংক্রান্ত কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও এ অঙ্গীকার প্রযোজ্য হবে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মধ্যে একটি সহযোগিতা স্মারক (এমওসি) স্বাক্ষরকে দুই নেতা স্বাগত জানান।

এছাড়া, সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরকেও তাঁরা স্বাগত জানান।

বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নে প্রতিশ্রুত ইয়েন ঋণ প্রকল্পটিকেও দুই নেতা স্বাগত জানান।

ব্যবসায়িক কার্যক্রমের গতি বজায় রাখতে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে জাপানি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল পাঠানোর পরিকল্পনা এবং অর্থনৈতিক সংলাপ আয়োজনের আগ্রহ প্রকাশ করেন দুই প্রধানমন্ত্রী।

তারা জাপান-বাংলাদেশ যৌথ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) প্ল্যাটফর্ম এবং বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মাধ্যমে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও মত দেন।

বাণিজ্য চুক্তি ও শিল্পের বহুমুখীকরণ

জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরকে স্বাগত জানান দুই নেতা। দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে চুক্তিটি দ্রুত কার্যকর করার অঙ্গীকারও তারা পুনর্ব্যক্ত করেন।

এ চুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্পের বহুমুখীকরণে জোর দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা। এতে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়া সহজ, টেকসই ও অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষম হবে।

তাকাইচি বলেন, আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (আরসিইপি) চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের অনুরোধ নিয়ে আরও আলোচনার অপেক্ষায় রয়েছে জাপান।

দুই নেতা অবাধ, ন্যায্য ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বজায় রাখার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু সহযোগিতা

জাপানের 'অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি ও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণে জরুরি সহায়তা ঋণ' কর্মসূচির আওতায় ৫০ বিলিয়ন ইয়েন সহায়তার জন্য জাপানকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

'পার্টনারশিপ অন ওয়াইড এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্সেস রেজিলিয়েন্স এশিয়া' বা 'পাওয়ার এশিয়া' উদ্যোগের আওতায় এটিই জাপানের প্রথম ইয়েন ঋণ প্রকল্প।

বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান কমাতে জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের অব্যাহত সমর্থনের কথা জানান তাকাইচি।

জাতীয়