‘আপনাদের কাছ থেকে আমরা অনুপ্রেরণা নিই, আপনারা যে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তা থেকে শিক্ষা নিই’—কথাটি বলেছেন ভারতের জেন-জি আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ নেহা বোরা।
গত বছর নেপাল ও মাদাগাস্কারে তীব্র জেন-জি আন্দোলনের ফলে সরকারের পতন ঘটে। টোগো, কেনিয়া ও মরক্কোয়ও তরুণরা নিজেদের অধিকারের জন্য লড়েছেন। বর্তমানে তরুণদের বিক্ষোভে উত্তাল বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ২০২৫ সালকে ‘প্রতিবাদের বছর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এশিয়া ও আফ্রিকার তরুণদের রাজপথে নামার অনুপ্রেরণার উৎস খুঁজতে গেলে ২০২৪ সালের বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের কথাও সামনে আসে। বাংলাদেশের চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর ২০২৫ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া জেন-জি আন্দোলনে বাংলাদেশ একটি অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে। শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় বুলেটের সামনে অসীম সাহসে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো আবু সাঈদের প্রসারিত দুই হাত আজ বিশ্বের অনেক তরুণের কাছে সাহস ও অনুপ্রেরণার প্রতীক। নয়াদিল্লিসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে তরুণ প্রজন্মের সরকারবিরোধী আন্দোলনে বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের ভাষা ও অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
যদিও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে জেন-জি আন্দোলনের ফলে কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটেছে, তবু কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সব ক্ষেত্রে আসেনি। এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন গণআন্দোলনে জেন-জি প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের অভিজ্ঞতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া এই প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহারের যুগে। তাই তাদের ‘উদ্বেগের প্রজন্ম’ (Generation Anxiety) বলেও অভিহিত করা হয়। তবে বহু দেশে দুর্নীতি ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের মূলে রয়েছে ভবিষ্যৎ নিয়ে জেন-জিদের শঙ্কা, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন এবং আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হওয়া কিছু ঘটনা, যা দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করেছে।
যেমন : টোগোতে দুর্নীতিবিরোধী গানের জন্য পরিচিত এক র্যাপারকে গ্রেপ্তারের পর বিক্ষোভে নামেন তরুণরা। কেনিয়ায় এক ব্লগারকে আইনি হেফাজতে হত্যা করার অভিযোগের পর জুনে বিক্ষোভ শুরু হয়। আন্দোলনের সম্মুখসারিতে ছিলেন ২৯ বছর বয়সি হানিফা আদান সাফিয়া। নেপালে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে সেপ্টেম্বরে আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে এবং সরকারের পতন ঘটে। মাদাগাস্কারে দুর্নীতিবিরোধী জেন-জি বিক্ষোভের মুখে অক্টোবরে সরকারের পতন হয়। মরক্কোতে হাসপাতালে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের মৃত্যুর পর অক্টোবরে তরুণদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
ইন্টারনেট সেন্সরশিপ, দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার, কর্মসংস্থানের ঘাটতি ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ে অতিষ্ঠ তরুণ প্রজন্ম আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত একের পর এক আন্দোলন গড়ে তুলেছে। তাদের কাছে প্রতিবাদ শুধু বর্তমান শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ নয়, বরং নিজেদের ভবিষ্যৎ ফিরে পাওয়ার লড়াই।
বাংলাদেশের তরুণদের গণভবন দখলের ঘটনাকে অনেকে শ্রীলঙ্কার আন্দোলন ও সরকার পতনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদেরও বলেছিলেন, “কারফিউ না দিলে ‘শ্রীলঙ্কা স্টাইলে’ গণভবন দখলের ষড়যন্ত্র ছিল।” এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, একটি দেশের গণআন্দোলন কীভাবে অন্য দেশের মানুষের কল্পনা, কৌশল ও প্রতিবাদের ভাষাকে প্রভাবিত করতে পারে।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুণদের আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। জেন-জিরা দেখেছে, শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া একটি আন্দোলন কীভাবে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন অতিক্রম করে বৃহত্তর গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশের আন্দোলনের ছবি, স্লোগান ও প্রতিরোধের ভাষা আন্তর্জাতিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে।
করোনা মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি এবং ধ্বংসাত্মক প্রভাবের পর বর্তমানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জ্বালানির দাম, আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ বাড়ছে। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, বেলজিয়াম ও পর্তুগালে অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। অন্যদিকে পোল্যান্ড ও গ্রিসেও রাজনৈতিক অসন্তোষ এবং আসন্ন নির্বাচন ঘিরে তরুণদের প্রতিবাদ সামনে এসেছে। দেশগুলোর আন্দোলনের কারণ ও গতিপথ এক না হলেও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় নীতির প্রতি অসন্তোষের সঙ্গে বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের অভিজ্ঞতার কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে।
এসব প্রতিবাদের প্রতিটিতে বাংলাদেশের মতো সরকার পতনের দাবি না থাকলেও অর্থনৈতিক সংকট কীভাবে বৃহত্তর রাজনৈতিক অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে, তার দৃষ্টান্ত দেখা যায়।
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু আন্দোলনটি দ্রুত বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়। দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, গুম-খুন, বৈষম্য ও অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে পুঞ্জীভূত জনঅসন্তোষ আন্দোলনকে সর্বজনীন করে তোলে। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হন। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া প্রতিবাদ ক্রমে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, জবাবদিহির অভাব ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধে রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে।
এরপর থেকে বিশ্বের নানা দেশে বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব আলোচনায় এসেছে। জেন-জিরা বাংলাদেশের আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে রাজপথে নেমেছে, কিংবা নিজেদের আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পেয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় নীতির প্রতি মানুষের ক্ষোভ কখন বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদকে বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দেয়, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে তারা সে শিক্ষা পেয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব দেখিয়েছে, তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন তখনই ব্যাপক গণআন্দোলনে পরিণত হয়, যখন তা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সংকট, অধিকারহীনতা ও দীর্ঘদিনের ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয়।
বিশ্বজুড়ে জেন-জির এই প্রতিবাদকে তাই শুধু একটি প্রজন্মের ক্ষোভ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে রাষ্ট্রের জবাবদিহি, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের প্রশ্ন। বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব এসব প্রশ্নকে একটি শক্তিশালী ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সামনে এনেছে। আবু সাঈদের প্রসারিত দুই হাত থেকে শুরু করে রাজপথে সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধ—সবকিছুই মনে করিয়ে দেয়, ভয় ও দমন-পীড়নের দেয়াল ভেঙে মানুষ যখন একসঙ্গে দাঁড়ায়, তখন পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। সেই সম্ভাবনাই জুলাই বিপ্লবকে আন্দোলনের একটি মডেল হিসেবে আলোচনায় এনেছে, যা থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণরা অনুপ্রেরণা নিচ্ছেন।
এ দেশের মানুষ বারবার মুক্তির স্বপ্ন দেখেছে, কিন্তু প্রতিবারই তারা বঞ্চিত হয়েছে। অগণিত মানুষের জীবন, বিপুল ধ্বংসযজ্ঞ ও সীমাহীন ত্যাগের পর ১৯৭১ সালে এ দেশের মানুষ নতুন একটি দেশ পেলেও স্বাধীনতার স্বপ্ন দ্রুতই তাদের জন্য চরম দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার দেশের মুক্তিকামী মানুষকে উপহার দিয়েছিল দুর্ভিক্ষ আর অবর্ণনীয় দুঃশাসন। কাঙ্ক্ষিত মুক্তির আশায় এ দেশের মানুষ এরপরও বারবার রাজপথে নেমে রক্ত দিয়েছে, জীবন দিয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই তার সুবিধা নিয়েছে একটি বিশেষ শ্রেণি। যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত মানুষের এই ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত চব্বিশের জুলাই মাসে শেখ হাসিনার দীর্ঘ দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বাঁধভাঙা জোয়ারে রূপ নেয়।
ভারতের সহায়তায় ক্ষমতায় থাকা শাসক শেখ হাসিনা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতা স্থায়ী করার জন্য তার সরকার বিরোধীদের বিরুদ্ধে হত্যা ও দমনের নীতি বেছে নিয়েছিল বলে সমালোচকরা অভিযোগ করেন। প্রতিবাদ দমনের ক্ষেত্রে হত্যা ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের অভিযোগও সামনে এসেছে। এভাবে দেশে ভীতি ও ত্রাসের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল বলে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য। এ ধরনের স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলাও একপর্যায়ে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশের মানুষ সম্মিলিতভাবে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে, একজন শাসক রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর যতই নিয়ন্ত্রণ আরোপ করুন না কেন, জনগণের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে তার পক্ষে অনির্দিষ্টকাল ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। সে কারণেই বাংলাদেশের জেন-জি আজ রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণদের আন্দোলনে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।

