মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন । ৪শ কারখানায় ছুটি ঘোষণা ইন্ধনদাতাদের তথ্য আছে : পুলিশ
আজাদী ডেস্ক | মঙ্গলবার , ৩ নভেম্বর, ২০২৬ at ৬:২৫ পূর্বাহ্ণ
তৈরি পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনের মাঝে গতকালও ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন কারখানায় বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। সহিংসতা ও ভাঙচুরের মধ্যে ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ায় এবং গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলের প্রায় ৪০০ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে সাভার ও আশুলিয়া অঞ্চলে ২৬৪টি এবং গাজীপুরে দেড় শতাধিক কারখানায় গতকালের জন্য ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া আটটি কারখানায় ভাঙচুরের কথা জানিয়েছে শিল্প পুলিশ। আন্দোলনের মধ্যে শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষে ১২ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন এবং দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে ঢাকা–নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কে প্রায় চার ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল। পুলিশ বলছে, শ্রমিকদের আন্দোলনকে ব্যবহার করে যারা উসকানি ও ইন্ধন দিচ্ছে তাদের তথ্য পুলিশের কাছে আছে এবং সংগ্রহ করা হচ্ছে। এদিকে মিরপুরে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পুলিশের ওপর হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ, পুলিশের গাড়িতে আগুন ও ট্রাফিক পুলিশ বক্স ভাঙচুরের অভিযোগে করা তিন মামলায় ২৬ জনকে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। খবর বিডিনিউজের।
গতকাল বিকালে শিল্প পুলিশ–২ আশুলিয়া আঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. মুমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, সাভার–আশুলিয়া অঞ্চলে ২৬৪টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া পিকার্ড বাংলাদেশ লিমিটেড, আর্টিস্টিক ডিজাইন, জনরন সোয়েটার লিমিটেড, ফেরারী গার্মেন্টস লিমিটেড, ডেনিটেঙ লিমিটেড, আনলিমা টেক্সটাইল লিমিটেড, আল ইসলাম টেক্সটাইল লিমিটেড এবং জি কিউ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। আর্টিস্টিক ফ্যাক্টরির সামনে শ্রমিকরা বিক্ষোভের সময় অগ্নিসংযোগ করেন।
শিল্প পুলিশ–২ গাজীপুর অঞ্চলের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন দুপুরে বলেন, আজও (গতকাল) শ্রমিকরা বিক্ষোভ করছেন। বিক্ষোভকালে শ্রমিকরা পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং বাস–ট্রাক ভাঙচুর করেছে। শ্রমিক আন্দোলনের কারণে দেড় শতাধিক কারখানা ছুটি দেওয়া হয়েছে।
এদিন সকাল থেকে কোনাবাড়ী, সফিপুর, মৌচাক ও পল্লীবিদ্যুৎ এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবস্থানের পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলোর ফটকেও সতর্ক অবস্থান নেয় পুলিশ ও শিল্প পুলিশ।
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে ঢাকা–নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়ক অবরোধ করেছেন কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। এতে করে ওই সড়কে প্রায় ৪ ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল।
মিরপুরে ২ পোশাক কারখানায় ভাঙচুর : মজুরি বাড়ানোর দাবিতে চলমান শ্রমিক বিক্ষোভের মধ্যে রাজধানীর মিরপুরে অন্তত দুটি পোশাক কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে মিরপুর–২ নম্বরের বড়বাগ এলাকায় সিরাজগঞ্জ ফ্যাশন লিমিটেড ও দেশওয়ান অ্যাপারেলস নামের দুটি কারখানায় ভাঙচুর করা হয়।
কারখানা ভাঙচুরের ঘটনার বিষয়ে মিরপুর মডেল থানার ওসি হাফিজুর রহমান বলেন, ঘটনা শুনে কারখানাগুলোতে পুলিশ সদস্য পাঠানো হয়েছে। দুপুর আড়াইটার দিকে সিরাজগঞ্জ ফ্যাশন লিমিটেডে গিয়ে দেখা যায়, কারখানাটির অভ্যর্থনা কক্ষের বিভিন্ন জিনিসপত্র ভাঙচুর করা হয়েছে। সেখানে থাকা সিসিটিভি মনিটর, চেয়ার–টেবিল, কক্ষের কাচ ও শ্রমিকদের ডিজিটাল হাজিরা যন্ত্র ভাঙচুর করা হয়েছে। সিঁড়ির পাশের কাচও ভাঙা দেখা গেছে। কারখানার চারতলাতেও ভাঙচুর করা হয়েছে। এ সময় কাচের আঘাতে এক নিরাপত্তাকর্মীর হাত কেটে গেছে বলে কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
সিরাজগঞ্জ ফ্যাশন লিমিটেডের নিরাপত্তা তত্ত্বাবধায়ক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, এক থেকে দেড়শ লোক এসে কারখানায় হামলা চালায়। তারা কারখানার কাচ ও বেশ কিছু যন্ত্রপাতি ভেঙেছে।
সিরাজগঞ্জ ফ্যাশন লিমিটেডে ভাঙচুরের আগে পাশের দেশওয়ান অ্যাপারেলসের সামনে যায় বিক্ষুব্ধ একটি দল। কারখানাটির সামনে অবস্থান নিয়ে কাজ করতে থাকা শ্রমিকদের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয় বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। বেলা সাড়ে ১০টার দিকে কয়েকজন ইট ছুড়লে কারখানাটির সামনের অংশের দুই জায়গার কাচ ভেঙে যায়।
এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মিরপুর গোলচত্বরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম, যিনি ক্রাইম অ্যান্ড প্রিভেনশন উত্তরের দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি বলেন, শ্রমিক মজুরি বোর্ড গঠনের পর বিষয়টি নিয়ে কাজ চলমান রয়েছে। এ অবস্থায় রাস্তা বন্ধ করা, সড়ক অবরোধ, গাড়ি বা কারখানায় ভাঙচুরের কোনো কারণ তারা দেখছেন না।
বিকাল ৩টার দিকে মিরপুর সেকশন–৭–এর শিল্প এলাকায় গিয়ে অন্তত ছয়টি কারখানার সামনে ঘুরে দেখা যায়, সেখানে কাজ বন্ধ রয়েছে এবং কারখানাগুলোর ফটক বন্ধ রাখা হয়েছে। সুমন ফ্যাশন, মদিনা ফ্যাশন, এফএফএ ফ্যাশন ও মহুয়া ট্রেডার্সের সামনের এক চায়ের দোকানদার বলেন, শ্রমিকরা সকালে কারখানায় এসে হাজিরা দিয়ে বের হয়ে গেছেন।
যা বলছেন শ্রমিকরা : নারায়ণগঞ্জের মেট্রো নিটিং অ্যান্ড ডাইং কারখানার শ্রমিক শহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু বাসা ভাড়াই তো সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। এক মাসের বাজারে লাগে আরও ১০ হাজার। চিকিৎসার একটা টেস্ট করাইতে লাগে পাঁচ হাজার টাকা। বাকি টাকা আমরা কই থেইকা জোগার করমু? আমাদের দাবি একটাই, বেতন ৩০ হাজার করতে হবে।
হাবিবুর রহমান নামের আরেক শ্রমিক বলেন, চার সদস্যের পরিবারে তিনিই একমাত্র উপার্জনকারী। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বিদ্যমান মজুরিতে তাদের সংসার চালানো যাচ্ছে না।
ইন্ধনদাতাদের তথ্য আছে : পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনকে ব্যবহার করে যারা উসকানি ও ইন্ধন দিচ্ছে তাদের তথ্য পুলিশের কাছে আছে এবং সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেছেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও যারা অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করছে, নিশ্চয়ই তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন। যারা অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং হবে। যারা এ রকম অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করছে, তাদের ইন্ধনদাতা কারা, যাবতীয় তথ্য কিন্তু পুলিশ সংগ্রহ করছে, তাদের কাছে আছে এবং তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত আছে।
তিন মামলায় ২৬ জন কারাগারে : রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পুলিশের ওপর হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ, পুলিশের গাড়িতে আগুন ও ট্রাফিক পুলিশ বঙ ভাঙচুরের অভিযোগে করা তিন মামলায় ২৬ জনকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। গতকাল ঢাকার দুই মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আলাদাভাবে শুনানি করে এ আদেশ দেয়।
এর মধ্যে পল্লবী থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা একটি মামলায় ১৩ জন, বিস্ফোরক দ্রব্য আইন ও দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় করা আরেক মামলায় সাতজন এবং মিরপুর মডেল থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় ছয়জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান বাবুল আখতারের : কাজে ফিরতে আন্দোলনরত পোশাক শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এ খাতের জন্য গঠিত নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সদস্য বাবুল আখতার। তিনি বলেছেন, শ্রমিক ভাইদেরকে অনুরোধ করছি, আপনারা কাজে ফিরে যান এবং আপনারা আপনাদের নিয়মিত কাজে যোগ দেন। অন্য কারও উস্কানিতে, অন্য কারও ধরনের প্ররোচনায় পা দিয়ে আপনাদের শিল্পকারখানা ধ্বংস আপনারা করবেন না। এখানে আপনারা কাজ করেন, এই শিল্পটা আপনাদের জন্যও দরকার, সরকারের জন্য দরকার, মালিকের জন্য দরকার। যেহেতু এই ফেডারেশনগুলো আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ধর্মঘট ডাকিনি বা বলিনি, তার পরও যে সমস্ত শ্রমিক অন্যায়–অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাহলে কিন্তু বিপদে পড়লে শ্রমিক ফেডারেশনগুলোকে আপনারা পাশে পাবেন না।

