আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির চিফ অব স্টাফ আন্দ্রি ইয়ারম্যাক পদত্যাগ করেছেন। গতকাল শুক্রবার রাতে প্রেসিডেন্ট কর্তৃক ঘোষিত এ সিদ্ধান্ত দেশটির সাম্প্রতিক দুর্নীতি তদন্ত, রাজনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক আলোচনার জটিল প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
জেলেনস্কির কার্যালয়ের নিকটস্থ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে শুরু করে। অভিযোগে বলা হয়, প্রেসিডেন্টের কয়েকজন আস্থাভাজন ব্যক্তি ও কিছু মন্ত্রী জ্বালানি খাত থেকে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ করেছেন। দেশে চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির ঘাটতি ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তির মধ্যেই এ তথ্য প্রকাশ পেলে জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়।
অভিযোগ প্রকাশের পর ইউক্রেনের দুটি দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা আন্দ্রি ইয়ারম্যাকের বাড়িতে তল্লাশি চালায়। যদিও এখন পর্যন্ত তদন্তে তার সরাসরি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি, তবে অভিযোগের তীর তার দিকেও রয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছিল। এ পরিস্থিতিতে জেলেনস্কি প্রশাসনের ওপর চাপ আরও বাড়তে থাকে এবং শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ইয়ারম্যাককে ইউক্রেনের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, কূটনৈতিক যোগাযোগ, আন্তর্জাতিক জোটের সঙ্গে সমন্বয় এবং যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় তার প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি বিশেষভাবে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে গঠিত প্রতিনিধিদলের প্রধান আলোচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ফলে তার পদত্যাগ দেশটির চলমান কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
দুর্নীতির সাম্প্রতিক অভিযোগ ইউক্রেন সরকারের জন্য এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। জ্বালানি খাত ইউক্রেনের যুদ্ধকালীন অর্থনীতি ও জনজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাশিয়ার সামরিক হামলা ও অবকাঠামো ধ্বংসের কারণে জ্বালানির সরবরাহ দীর্ঘদিন ধরে ব্যাহত। এমন প্রেক্ষাপটে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ দেশটির সাধারণ মানুষের আস্থা ও সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সরকারের এসব অভিযোগ স্বচ্ছভাবে মোকাবিলা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনা ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক দুর্নীতির ঘটনা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। যুদ্ধাবসান বা অস্ত্রবিরতি বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা যেখানে অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে, সেখানে সরকারের অভ্যন্তরীণ এই অস্থিরতা আলোচনার গতি মন্থর করতে পারে। তাই ইয়ারম্যাকের পদত্যাগের পর নতুন আলোচক নিয়োগ ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া পুনর্গঠনের বিষয়টি বর্তমান পরিস্থিতিতে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইয়ারম্যাকের প্রভাব বিস্তার ছিল ইউক্রেনের প্রশাসনের প্রায় সব ক্ষেত্রে। তার নেতৃত্বে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, মানবিক সহায়তা, প্রতিরক্ষা সমন্বয় এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়েছে। পদত্যাগের ফলে এসব ক্ষেত্রের দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন হবে। নতুন চিফ অব স্টাফ নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সাময়িক সমন্বয় কাঠামো গঠন করতে হতে পারে।
এদিকে, জেলেনস্কি প্রশাসন দুর্নীতি দমন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছে। তদন্ত জোরদার করা, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ আরও ত্বরান্বিত হতে পারে। দুর্নীতি বিরোধী সংস্থাগুলোও সাম্প্রতিক তল্লাশি ও তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত ফলাফল প্রকাশের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানা গেছে।
ইয়ারম্যাক পদত্যাগ করায় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে এখন নতুন প্রধান আলোচক নিয়োগ দিতে হবে। যুদ্ধাবসান, আন্তর্জাতিক সহায়তা সংগ্রহ এবং ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কৌশল নির্ধারণে এই পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির অভিজ্ঞতা, কূটনৈতিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ইউক্রেনের পরবর্তী রাজনৈতিক-সামরিক পরিস্থিতিতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


