অমীমাংসিত হত্যা রহস্যে অনুপ্রাণিত ওয়েব ফিল্ম ‘অমীমাংসিত’ অবশেষে মুক্তির অপেক্ষায়

অমীমাংসিত হত্যা রহস্যে অনুপ্রাণিত ওয়েব ফিল্ম ‘অমীমাংসিত’ অবশেষে মুক্তির অপেক্ষায়

বিনোদন ডেস্ক

এক যুগ আগে সংঘটিত এক সাংবাদিক দম্পতির নৃশংস হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের গণমাধ্যম অঙ্গনে ব্যাপক আলোচিত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা হিসেবে পরিচিত। আজও যার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি এবং যার বিচারাধীন মামলা এখনো উচ্চ আদালতে প্রক্রিয়াধীন। সেই বাস্তব ঘটনার ছায়া অবলম্বনে নির্মিত ওয়েব ফিল্ম ‘অমীমাংসিত’ দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকলেও অবশেষে মুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ডিসেম্বরেই এটি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আইস্ক্রিনে প্রদর্শিত হওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।

ফিল্মটির নির্মাতা রায়হান রাফী বহুদিন ধরেই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছিলেন। গত বছরই ওয়েব ফিল্মটি মুক্তির পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তৎকালীন চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড এতে আপত্তি জানিয়ে ছাড়পত্র দেয়নি। বোর্ড জানায়, গল্পে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের উপস্থাপন, চিত্রনাট্য ও সংলাপে বাস্তব ঘটনার সঙ্গে মিল পাওয়া, এবং বিচারাধীন একটি মামলার প্রতিফলন দেখা যাওয়ায় এটি প্রচারিত হলে ভুল ব্যাখ্যার জন্ম দিতে পারে। একই সঙ্গে বোর্ডের মতে, এমন উপস্থাপন চলমান তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। এসব কারণ দেখিয়ে বোর্ড ছবিটি আটকে রাখে এবং নির্মাতাদের বেশ কিছু দিক পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেয়।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত টিজার থেকেই দর্শকদের মধ্যে আলোচনার জন্ম হয়। টিজারের দৃশ্যাবলি ও উপস্থাপনার ধরন দেখে অনেকেই অনুমান করেন, এটি দেশের আলোচিত সাংবাদিক দম্পতির হত্যাকাণ্ড অবলম্বনে তৈরি। যদিও নির্মাতা দল শুরু থেকেই একে কল্পনানির্ভর কাহিনি হিসেবে উল্লেখ করেছে, তবুও বাস্তব ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু উপাদান থাকার কারণে এটি আরও বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করে।

দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকা চলচ্চিত্রটির মুক্তির বিষয়ে সম্প্রতি অগ্রগতি ঘটে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সেন্সর বোর্ডের আপত্তির জায়গাগুলো পর্যালোচনা করে নতুন করে মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার পর মুক্তির পথ তৈরি হয়েছে। ফলে প্রায় দেড় বছর পর অবশেষে ওয়েব ফিল্মটি দর্শকের সামনে আসতে যাচ্ছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ডিসেম্বরেই এটি আইস্ক্রিনে প্রচার শুরু হবে।

‘অমীমাংসিত’ একটি থ্রিলার-ধাঁচের চলচ্চিত্র, যেখানে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা দুই চরিত্রের জীবন, দ্বন্দ্ব এবং এক ভয়াবহ ঘটনার পরবর্তী পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে। নির্মাতা দল জানিয়েছে, গল্পে পেশাগত ঝুঁকি, অনুসন্ধানী কাজের চাপ, সামাজিক প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক—এই চারটি স্তরকে একত্রে বিবেচনায় রেখে নির্মাণশৈলী তৈরি করা হয়েছে। দর্শককে কাহিনির ভেতরে নিয়ে যেতে ছায়া, আলো, শব্দ এবং সম্পাদনার ওপর বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়েছে, যাতে রহস্যধর্মী আবহ টিকে থাকে।

ফিল্মটিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইমতিয়াজ বর্ষণ এবং তানজিকা আমিন। উভয় শিল্পীর মতে, বাস্তব ঘটনার প্রভাব থাকায় তাদের চরিত্রগুলোতে গভীরতা ও জটিলতা রয়েছে, যা নির্মাণ প্রক্রিয়াকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছিল। চরিত্রগুলোতে সাংবাদিকতার পেশাগত কঠিন বাস্তবতা ও মানসিক চাপ ফুটিয়ে তুলতে নিয়মিত গবেষণা ও প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। নির্মাতারা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন, ঘটনাটির প্রতি সংবেদনশীলতা বজায় রেখে শিল্পসম্মত উপস্থাপন করা হয়।

বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছরে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের প্রসার ঘটায় নতুন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ ও মুক্তির সুযোগ বেড়েছে। তবে বাস্তব ঘটনার ছায়া অবলম্বনে নির্মিত কন্টেন্ট নিয়ে নানা সময় আইনি ও নৈতিক বিবেচনার প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে বিচারাধীন কোনো ঘটনা কেন্দ্র করে নির্মাণ হলে, সেটি প্রচারের আগে যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে যায়। ‘অমীমাংসিত’–এর ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। বোর্ডের দীর্ঘ পর্যালোচনা, নির্মাতাদের সংশোধন এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে এর মুক্তি প্রক্রিয়া প্রায় দুই বছর ধরে চলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই চলচ্চিত্রের মুক্তি বাংলাদেশের সৃজনশীল কনটেন্ট নির্মাণে নতুন ধরনের আলোচনার জন্ম দিতে পারে। বাস্তব ঘটনার ছায়া অবলম্বনে নির্মাণের ক্ষেত্রে নৈতিকতা, আইনি বিস্তার, সতর্কতা ও শিল্পমান—এই চারটি কাঠামো ভবিষ্যতের নির্মাতাদের জন্য দিকনির্দেশনা তৈরি করবে। পাশাপাশি দর্শকরাও বিষয়বস্তুর উপস্থাপন কেমন হয়েছে এবং সেটা বাস্তব ঘটনার প্রতি সংবেদনশীল কিনা—তা নিয়ে মূল্যায়ন করবেন।

সব মিলিয়ে, ‘অমীমাংসিত’ বহু প্রতীক্ষিত একটি ওয়েব ফিল্ম হিসেবে দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। পরিচালক, অভিনয়শিল্পী, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ও দর্শকদের প্রত্যাশা—সবকিছুর মিলেই এটি চলতি বছরের অন্যতম আলোচিত মুক্তি হয়ে উঠতে পারে।

বিনোদন