সিদ্ধিরগঞ্জে তরুণ তাকবির হত্যার ঘটনার রহস্য উদঘাটন, পিবিআইয়ের কাছে দুই আসামির স্বীকারোক্তি

সিদ্ধিরগঞ্জে তরুণ তাকবির হত্যার ঘটনার রহস্য উদঘাটন, পিবিআইয়ের কাছে দুই আসামির স্বীকারোক্তি

জেলা প্রতিনিধি

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিত্যক্ত ভবনে তরুণ তাকবির আহমেদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মাত্র এক দিনে মূল রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মামলার পরদিনই সন্দেহভাজন দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও নিহতের মোবাইল ফোন উদ্ধার করার পর এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।

পিবিআইয়ের নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ে শনিবার (২৯ নভেম্বর) আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার মো. মোস্তফা কামাল রাশেদ তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরেন। তিনি জানান, তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও প্রত্যক্ষ অনুসন্ধানের সমন্বয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনাটির সংশ্লিষ্টতাসহ প্রধান অভিযুক্তদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

তদন্তে জানা যায়, ২২ বছর বয়সী তাকবির আহমেদ বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং সে কারণে সাম্প্রতিক সময়ে অধিকাংশ সময় বাড়িতেই থাকতেন। গত ২৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় তিনি বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আর ফেরেননি। পরিবার সদস্যরা রাতভর বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও কোনো সন্ধান পাননি। পরদিন ২৬ নভেম্বর দুপুরে স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পাওয়া যায় যে ওয়াপদা কলোনির পানি উন্নয়ন বোর্ড আবাসিক এলাকার একটি পরিত্যক্ত ভবনের প্রথম তলায় এক তরুণের মরদেহ পড়ে আছে। পরে পরিবার গিয়ে মরদেহটি তাকবির আহমেদের বলে নিশ্চিত করে।

ঘটনার পর তাকবিরের বাবা নুর মোহাম্মদ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তরের পর তদন্তকারীরা সম্ভাব্য যোগাযোগ নম্বর, শেষ অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কার্যক্রম বিশ্লেষণ শুরু করেন। এ সময় বিভিন্ন সূত্র মিলে কয়েকজনের কার্যকলাপ সন্দেহজনক বলে প্রতীয়মান হয়।

পরবর্তী পর্যায়ে ২৭ নভেম্বর সন্ধ্যা ৬টায় সোনারগাঁওয়ের লাঙ্গলবন্দ এলাকা থেকে মো. হারুন (৩৪) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে একই দিন সন্ধ্যা ৭টায় সিদ্ধিরগঞ্জ ওয়াপদা কলোনির মোড় থেকে মো. রফিকুল (৩৮) নামের আরেক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর রফিকুলের দেখানো মতে তার ঘরের সিলিংয়ের ভেতর লুকিয়ে রাখা তাকবিরের মোবাইল ফোন উদ্ধার করে তদন্ত দল।

পিবিআই জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে দুই আসামি ঘটনাটির পূর্বাপর পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেয়। তাঁরা জানান, তাকবিরের সঙ্গে অনলাইনভিত্তিক লেনদেন সংক্রান্ত বিরোধের সূত্র ধরেই ঘটনাটি ঘটে। মাদক গ্রহণের পর পরিস্থিতি উত্তেজনাকর হয়ে ওঠে এবং পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তাকবিরকে পরিত্যক্ত ভবনে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে তারা পুরোনো একটি সিমকার্ড ব্যবহার করে তাকবিরের বাবার কাছে মুক্তিপণের দাবি করে।

তদন্তে আরও জানা গেছে, ঘটনার স্থান হিসেবে নির্বাচিত পরিত্যক্ত ভবনটি দীর্ঘদিন ব্যবহৃত না হওয়ায় সেখানে যাতায়াত কম ছিল, যা অপরাধীদের কাছে ঘটনাস্থল নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। অপরাধ সংঘটনের পর মোবাইল ফোন লুকিয়ে ফেলা ও সিমকার্ড পরিবর্তন করাকে তদন্ত বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করেছে পিবিআই।

অভিযুক্তদের পরদিন ২৮ নভেম্বর আদালতে সোপর্দ করা হলে দুজনই স্বেচ্ছায় দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। পিবিআই জানিয়েছে, হত্যার উদ্দেশ্য, পূর্বপ্রস্তুতি, ব্যবহৃত উপকরণসহ সব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি অভিযুক্তদের আগের কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সংস্থাটি আরও জানায়, ফরেনসিক পরীক্ষা, অপরাধস্থল বিশ্লেষণ, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ ও প্রযুক্তিগত তথ্য যাচাইয়ের ভিত্তিতে শিগগিরই মামলার চার্জশিট দাখিলের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। মামলাটি দ্রুত বিচারযোগ্য অপরাধের আওতায় পড়ে কি না, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত সময়ে ঘটনাটির রহস্য উদঘাটন ভিকটিমের পরিবারকে মামলার অগ্রগতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে। একই সঙ্গে অনলাইন লেনদেন ও ব্যক্তিগত বিরোধ থেকে উদ্ভূত অপরাধ প্রবণতার ঝুঁকি চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো সংশ্লিষ্ট এলাকায় নজরদারি জোরদার করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

রাজনীতি