বিপিএলে ১২২ রানে অলআউট ঢাকা ক্যাপিটালস, চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে জয়যাত্রা

বিপিএলে ১২২ রানে অলআউট ঢাকা ক্যাপিটালস, চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে জয়যাত্রা

 

খেলাধূলা ডেস্ক

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) চলমান আসরে চট্টগ্রাম রয়্যালসের বিপক্ষে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে ১২২ রানে অলআউট হয়েছে ঢাকা ক্যাপিটালস। বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে টসে জয়ী হয়ে আগে বোলিং করার সিদ্ধান্ত নেন চট্টগ্রামের অধিনায়ক শেখ মেহেদী হাসান। তার সিদ্ধান্ত সঠিক প্রমাণ করে শুরু থেকেই ঢাকার ব্যাটিং লাইনআপে চট্টগ্রামের বোলাররা চাপ তৈরি করেন এবং ধারাবাহিক উইকেট শিকারের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে স্বল্প রানে গুটিয়ে দেন।

ম্যাচের শুরুতেই ঢাকার দুই ওপেনার ব্যাট হাতে ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। ওপেনার সাইফ হাসান টানা তিন ম্যাচেও দুই অঙ্কের রানের দেখা পাননি। ইনিংসের প্রথম ওভারেই দলীয় ৩ রানের মাথায় শরিফুল ইসলামের বল প্যাডে লাগলে আম্পায়ার এলবিডব্লিউয়ের সিদ্ধান্ত দেন। চলতি বিপিএলে তিন ইনিংস মিলিয়ে তার সংগ্রহ মাত্র ১১ রান। অপর ওপেনার জুবাইদ আকবরীও শরিফুল ইসলামের বলে ডিপ পয়েন্টে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। ইনিংসের শুরুতেই দুই ওপেনারের বিদায়ে ঢাকার ওপর চাপ বাড়তে থাকে।

তিন নম্বরে ব্যাট করতে নেমে উসমান খান কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। তবে তানভির ইসলামের বল মোকাবিলা করতে গিয়ে তিনি উইকেটের সামনে এগিয়ে এসে শট খেলতে যান এবং বল মিস করলে উইকেটকিপার দ্রুত স্টাম্প ভেঙে দেন। ১৫ বলে ২১ রান করে স্টাম্পিংয়ের শিকার হয়ে ফেরেন উসমান। এরপর ঢাকার মিডল অর্ডারেও ব্যাটাররা ক্রিজে থিতু হওয়ার সুযোগ পাননি। শামীম হোসেন পাটোয়ারি আগের ম্যাচে ঝলমলে ইনিংস খেললেও এদিন শেখ মেহেদীর বল মোকাবিলায় ব্যর্থ হন। ৭ বলে ৪ রান করে তিনিও স্টাম্পিং হয়ে ফেরেন।

উইকেট হারানোর মিছিলে ঢাকার ব্যাটিং বিপর্যয় গভীর হতে থাকে। অধিনায়ক মোহাম্মদ মিঠুন লং অনে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন ৮ রান করে, তানভির ইসলামের বলে। ৪৬ রানের মধ্যেই ৫ উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়ে ঢাকা। এরপর সাব্বির রহমান বড় শট খেলতে গিয়ে শেখ মেহেদীর বলে স্টাম্পিং হয়ে ফেরেন ৯ রান করে। ৫৫ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে ঢাকার নিয়ন্ত্রণ প্রায় পুরোপুরি চট্টগ্রামের দিকে চলে যায়।

পরবর্তী ব্যাটার ইমাদ ওয়াসিমও ক্রিজে এসে বড় শট খেলার প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হন। লেগ স্টাম্পের বাইরের বলে এগিয়ে এসে শট খেলতে গিয়ে তিনি বল মিস করেন এবং উইকেটকিপার অ্যাডাম রসিংটন দ্রুত স্টাম্প ভেঙে দেন। ৬৬ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে দ্রুত অলআউট হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয় ঢাকার জন্য। এমন পরিস্থিতিতে ইনিংস পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেন নাসির হোসেন ও মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন। তারা দুজন মিলে ৩৬ বলে ৪৮ রানের জুটি গড়ে ঢাকাকে আরও বড় বিপর্যয় থেকে সাময়িকভাবে টেনে তোলেন। নাসির ১৭ রান করে আউট হলে ক্রিজে এসে তাসকিন আহমেদ ও সালমান মির্জা কেউই উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ গড়তে পারেননি। ১৯.৪ ওভারেই ১২২ রানে অলআউট হয়ে যায় ঢাকা।

ইনিংসে ঢাকার হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ আসে সাইফ উদ্দিনের ব্যাট থেকে। ২৫ বলে অপরাজিত ৩৩ রানের ইনিংস খেলেন তিনি, যা দলের জন্য সর্বোচ্চ এবং একমাত্র উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিগত সংগ্রহ। দলীয় ব্যাটিংয়ে টপ অর্ডার ও মিডল অর্ডারের ব্যর্থতার কারণে জুটিভিত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি ঢাকার জন্য। বিপিএলের মতো টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে যেখানে দ্রুত রান তোলার পাশাপাশি ক্রিজে টিকে থেকে জুটি গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে ওপেনিং ব্যাটারদের ধারাবাহিক ব্যর্থতা দলের কৌশলগত কাঠামোকে নাজুক করে তুলেছে। বিশেষ করে সাইফ হাসানের টানা ব্যর্থতা ওপেনিং জুটিতে স্থায়িত্বের অভাব তৈরি করেছে, যা পাওয়ারপ্লে সুবিধা আদায় ও ইনিংসের ভিত্তি গঠনে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

চট্টগ্রাম রয়্যালসের বোলিং ইউনিট এদিন ছিল অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও কৌশলগতভাবে সফল। পেসার শরিফুল ইসলাম ও স্পিনার তানভির ইসলাম সর্বোচ্চ ৩টি করে উইকেট শিকার করেন। শরিফুল তার সুইং ও সিম মুভমেন্ট কাজে লাগিয়ে পাওয়ারপ্লেতেই ঢাকার ব্যাটিং পরিকল্পনা ভেঙে দেন। অপরদিকে তানভির তার বৈচিত্র্যময় স্পিন ও ক্রিজের সামনে ব্যাটারদের টেনে এনে স্টাম্পিং ফাঁদে ফেলতে সক্ষম হন। অধিনায়ক শেখ মেহেদী নিজেও বল হাতে সফল ছিলেন এবং দুইটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট স্টাম্পিংয়ের মাধ্যমে নিজের ঝুলিতে নেন, যা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

বিপিএলের ইতিহাসে টসে জিতে আগে বোলিং করার কৌশল অনেক সময় সফল প্রমাণিত হয়েছে, বিশেষ করে যখন উইকেট ব্যাটিংয়ের শুরুতে পেস ও বাউন্সে সহায়ক আচরণ করে। জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের উইকেট এদিন শুরুতে কিছুটা মুভমেন্ট ও টার্ন সরবরাহ করায় চট্টগ্রামের বোলাররা সেই সুবিধা কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়েছেন। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ১২২ রানের মতো স্কোর সাধারণত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও ইনিংসের গতিপ্রবাহ, উইকেট হারানোর সময় এবং জুটির অনিয়মিততা বিবেচনায় এটি ছিল চট্টগ্রামের জন্য তুলনামূলক সহজ নিয়ন্ত্রণযোগ্য লক্ষ্য।

ঢাকা ক্যাপিটালসের জন্য এই ম্যাচটি ব্যাটিং কৌশল, ওপেনিং জুটির সমন্বয়, পাওয়ারপ্লে ব্যবহারের পরিকল্পনা এবং উইকেট সংরক্ষণের সক্ষমতা পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। বিপিএলের মতো টুর্নামেন্টে যেখানে দলীয় সমন্বয় ও নির্দিষ্ট ভূমিকা অনুযায়ী পারফরম্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে টপ অর্ডারের ব্যাটারদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা পুরো ইনিংসের স্থায়িত্ব ও ম্যাচের গতিপথে প্রভাব ফেলেছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম রয়্যালসের বোলিং পারফরম্যান্স দলীয় কৌশল বাস্তবায়ন ও প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের এক মানসম্মত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

চট্টগ্রামের হয়ে ৩টি করে উইকেট শিকার করা শরিফুল ও তানভির ইসলামের নিয়ন্ত্রিত বোলিং এবং শেখ মেহেদীর অধিনায়কত্ব মিলিয়ে ম্যাচের প্রথমার্ধেই ঢাকাকে পিছিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে, যা বিপিএলের প্রতিযোগিতামূলক লড়াইয়ে চট্টগ্রামের জন্য ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত।

খেলাধূলা শীর্ষ সংবাদ