শিক্ষা ডেস্ক
বছরের প্রথম দিনে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও মাধ্যমিক স্তরের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পাঠ্যবইয়ের অভাবে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেও বিনা মূল্যের নতুন পাঠ্যপুস্তক শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায়নি। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্রে জানা গেছে, মাধ্যমিক স্তরের প্রায় ৬০ লাখ শিক্ষার্থী বছরের প্রথম দিনে বিনা মূল্যের পাঠ্যবই পায়নি। এর মধ্যে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বহু প্রতিষ্ঠানে একটি বইও সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। মাধ্যমিক স্তরে বই না পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ হলেও দেশের মাধ্যমিক স্তরের মোট শিক্ষার্থী প্রায় ৬০ লাখ নয়; প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি এবং তাদের একটি বড় অংশ পাঠ্যপুস্তক বঞ্চিত অবস্থায় শিক্ষাবর্ষ শুরু করেছে।
প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম দিনে স্কুলগুলোতে পাঠ্যবই না পৌঁছানোর বিপরীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশের বইয়ের দোকানগুলোতে গাইড, নোট ও তথাকথিত সহায়ক বইয়ের সরব উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। দোকানগুলোতে রঙিন প্রচ্ছদের নোট–গাইড বইয়ের স্তূপ তৈরি হয়েছে, যা মূলত পাঠ্যবই বিতরণে শূন্যতা তৈরি হওয়ায় শিক্ষার্থীদের বিকল্প উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অভিভাবক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাঠ্যবই সংকটের সুযোগে প্রতিবছর গাইড বইয়ের বাজার বিস্তৃত হচ্ছে এবং এ প্রবণতা গত দেড় দশক ধরে অব্যাহত রয়েছে।
এনসিটিবি গত ১৫ বছর ধরে মার্চ–এপ্রিলের আগে শতভাগ পাঠ্যবই বিতরণ সম্পন্ন করতে পারেনি। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষেও একই প্রবণতার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। মাধ্যমিক স্তরের প্রায় ৬০ লাখ শিক্ষার্থী বিনা মূল্যের বই না পাওয়ার ফলে বিকল্প হিসেবে গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গাইড বইয়ের বাজার বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার আর্থিক পরিসরে পৌঁছেছে, যেখানে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার এই বাজার একটি শক্তিশালী ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই বাজারের বড় অংশ নোট ও গাইড বই কেন্দ্রিক, যার সিংহভাগ একটি নির্দিষ্ট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের দখলে রয়েছে বলে শিক্ষা খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে প্রকাশনা খাতে প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য আরও জোরদার হচ্ছে।
স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, বইয়ের তালিকা দেওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রকাশনার গাইড, নোট ও ব্যাকরণ বই কিনতে উৎসাহিত বা পরোক্ষভাবে বাধ্য করা হয়। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ জানিয়েছে, শ্রেণিকক্ষে নির্দিষ্ট প্রকাশনার গাইড বই না কিনলে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা বা পরীক্ষায় ফল খারাপ হওয়ার ভয় দেখানো হয়। অভিভাবকরা বলছেন, রাষ্ট্র বিনা মূল্যে পাঠ্যবই সরবরাহ করলেও বাস্তবে শিক্ষা ব্যয়ের বড় অংশই গাইড, নোট ও সহায়ক বই কিনতে ব্যয় করতে হচ্ছে, যা অনেক পরিবারের জন্য আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
২০০৮ সালে উচ্চ আদালতের এক আদেশে নোট ও গাইড বই নিষিদ্ধ করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি এবং পাঠ্যবইনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিত করা। তবে বাস্তবে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়নি। গাইড বই এখন আর ‘গাইড’ নামে সরাসরি প্রকাশিত না হয়ে ‘সহায়ক বই’, ‘অনুশীলনমূলক বই’, ‘একের ভেতর সব’, ‘প্রশ্নব্যাংক ভিত্তিক সমাধান’, ‘শর্ট সাজেশন’ ইত্যাদি নামে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। বইয়ের দোকান, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং বিদ্যালয় সংলগ্ন বিপণি—সবখানেই এসব বই সহজলভ্য। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের ভেতরেও এসব বইয়ের প্রচার লক্ষ্য করা গেছে, যা নজরদারির ঘাটতিকে স্পষ্ট করেছে।
শিক্ষা খাত সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন, পাঠ্যবই মুদ্রণ ও বিতরণের আগেই গাইড বই কীভাবে বাজারে আসে। সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ের সিলেবাস, নম্বর বণ্টন, মূল্যায়ন কাঠামো এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুদ্রণের আগের খসড়া বা র’ কপি নির্দিষ্ট প্রকাশকদের কাছে আগেই পৌঁছে যায়। এর ফলে জানুয়ারির শুরুতেই নতুন সিলেবাসভিত্তিক গাইড বই বাজারে চলে আসে, আর পাঠ্যবই বিতরণে মাসের পর মাস বিলম্ব হয়। এতে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন প্রক্রিয়ার গোপনীয়তা রক্ষা এবং তথ্যপ্রবাহ ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
২০২৬ শিক্ষাবর্ষে বই ছাপার দরপত্র তুলনামূলক আগেই আহ্বান করা হলেও মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপা ও কার্যাদেশ প্রদানে রিটেন্ডার, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা এবং কার্যাদেশ আটকে থাকার মতো জটিলতায় মুদ্রণ কার্যক্রম দেরিতে শুরু হয়। নবম শ্রেণির কিছু বইয়ের কার্যাদেশ আড়াই মাস পর্যন্ত আটকে থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও এর নির্দিষ্ট প্রশাসনিক ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে আসেনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক জানিয়েছেন, দেশের শিক্ষা কাঠামো মূলত পরীক্ষানির্ভর হওয়ায় শিক্ষার্থীরা শেখার চেয়ে মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতিতে বেশি ঝুঁকছে। গাইড বইয়ে অধ্যায়ভিত্তিক প্রশ্নোত্তর, সাজেশন, নম্বরভাগ, সম্ভাব্য প্রশ্নের সমাধান এবং সংক্ষিপ্ত প্রস্তুতি কাঠামো সাজানো থাকায় শিক্ষার্থীদের চিন্তা–বিশ্লেষণের সুযোগ কমে যাচ্ছে। ফলে পাঠ্যবইয়ের মৌলিক ভূমিকা, বিশ্লেষণী পাঠাভ্যাস এবং সৃজনশীলতার বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
এনসিটিবি জানিয়েছে, পাঠ্যবইয়ের ডিজিটাল সংস্করণ অনলাইনে উন্মুক্ত করা হয়েছে, যা শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ব্যবহার করতে পারলেও গ্রাম, দুর্গম ও প্রান্তিক অঞ্চলের বড় অংশের কাছে এই সুবিধা কার্যকর বিকল্প হয়ে ওঠেনি। দেশে এখনো ডিজিটাল ডিভাইস, স্থিতিশীল ইন্টারনেট সংযোগ ও ডিজিটাল সাক্ষরতার বৈষম্য প্রকট থাকায় অনলাইন পাঠ্যবই সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারেনি। অন্যদিকে গাইড বইয়ের বাজার নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যালয় পর্যায়ে এর প্রচার বন্ধ এবং নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে সমন্বিত ও দৃশ্যমান নজরদারি কাঠামোর অভাব রয়ে গেছে।
পাঠ্যবই বিতরণে এই ধারাবাহিক বিলম্ব শিক্ষা ব্যয়ের কাঠামো, পাঠ্যপুস্তকনির্ভর শিক্ষার মৌলিক লক্ষ্য, তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং প্রকাশনা খাতের বাজার প্রতিযোগিতা—সবক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি করছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বই বিতরণে সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত, পাঠ্যবই প্রণয়ন তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা, প্রকাশনা বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং স্কুল পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি কাঠামো গড়ে তোলা না গেলে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইনির্ভর শিক্ষা নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের শুরুতে পাঠ্যবই সংকটের পুনরাবৃত্তি সেই দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জকেই আবার সামনে এনেছে।


