ভুয়া রাজনৈতিক ফটোকার্ড প্রচারের অভিযোগ তুললেন অপূর্ব

ভুয়া রাজনৈতিক ফটোকার্ড প্রচারের অভিযোগ তুললেন অপূর্ব

বিনোদন ডেস্ক

ঢাকা, ৩ জানুয়ারি ২০২৬: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের পরিচয় ও ছবি ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ প্রবণতার ধারাবাহিকতায় অভিনেতা জিয়াউল ফারুক অপূর্বর ছবি ব্যবহার করে ভুয়া রাজনৈতিক ফটোকার্ড ছড়ানোর অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অপূর্ব দাবি করেছেন, তার নাম ও ছবি ব্যবহার করে প্রচারিত ওই রাজনৈতিক বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘দৈনিক প্রতিবেদন’ নামের অ্যাকাউন্টসহ একাধিক ফেসবুক প্রোফাইল ও পেজ থেকে অপূর্বর ছবি সংবলিত ফটোকার্ড পোস্ট করা হচ্ছে, যেখানে তাকে কেন্দ্র করে বিতর্কিত রাজনৈতিক মন্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে। ওই ফটোকার্ডগুলোতে রাজনৈতিক পরিবর্তন, ক্ষমতার পালাবদল এবং স্বৈরাচারবিষয়ক মন্তব্য ব্যবহার করা হলেও অপূর্ব তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এসব বক্তব্য তার নয় বলে স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছেন।

২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি শুক্রবার বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ভুয়া ফটোকার্ডগুলোর স্ক্রিনশট প্রকাশ করে অপূর্ব একটি সতর্কতামূলক বিবৃতি দেন। ফটোকার্ডগুলোর মধ্যে একটিতে লেখা ছিল, ‘স্বৈরাচার তাড়াতে রাস্তায় নামলাম আর আজ প্রশ্ন জাগে, সত্যিই কি স্বৈরাচার বিদায় হলো নাকি আরও বড় স্বৈরাচারের হাতে পড়লাম।’ অন্য আরেকটি কার্ডে উল্লেখ করা হয়, ‘কোথাও স্বাধীনতা নেই। সব সময় ভয়ে থাকি, কখন যে জীবনটাই শেষ হয়ে যায়। তাহলে কি আগের স্বৈরাচারই ভালো ছিল?’ পোস্টগুলোর ভাষা ও ফ্রেমিং রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দেওয়ার উপযোগী হলেও এসব মন্তব্য তার নামে প্রচার করাকে ‘ডিজিটাল পরিচয় অপব্যবহার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন অভিনেতা।

ফটোকার্ডগুলো শেয়ার করার সময় অপূর্ব ক্যাপশনে লেখেন, ‘এ ধরনের ভুয়া নিউজ ও বিবৃতি প্রকাশে বিরত থাকুন। অন্যথায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ বিবৃতির মাধ্যমে তিনি গণমাধ্যম, অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতা এবং সামাজিক মাধ্যম পরিচালনাকারীদের প্রতি দায়িত্বশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন যে, রাজনৈতিক ইস্যুতে তার কোনো বিবৃতি প্রচারের আগে সেটি তার অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্ম থেকে নিশ্চিত না হলে তা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে না।

ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও গ্রাফিক ডিজাইন টুলের সহজলভ্যতার কারণে ভুয়া ফটোকার্ড ও ডিপফেক-ভিত্তিক কনটেন্ট তৈরি করা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সহজ হয়েছে। এতে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের ছবি, ভিডিও বা কণ্ঠ ব্যবহার করে মনগড়া বক্তব্য উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব কনটেন্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়—কখনো জনমতকে প্রভাবিত করতে, কখনো সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে, আবার কখনো নির্দিষ্ট পক্ষকে সুবিধা দিতে। তবে অভিনেতা বা সেলিব্রিটির ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান যাচাই ছাড়া তাদের ছবি ব্যবহার করে বক্তব্য প্রচার করলে তা শুধু নৈতিকতা লঙ্ঘন নয়, আইনি ঝুঁকিও তৈরি করে।

বাংলাদেশে সেলিব্রিটিদের পরিচয় অপব্যবহার করে রাজনৈতিক কনটেন্ট প্রচার বন্ধে সাইবার নিরাপত্তা আইনের একাধিক ধারা প্রযোজ্য হতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল পরিচয় চুরি, মানহানি, ভুল তথ্য প্রচার, সামাজিক স্থিতিশীলতা বিঘ্ন এবং অনুমতি ছাড়া ছবি বা পরিচয় ব্যবহার। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, ভুয়া কনটেন্টের উৎস শনাক্ত ও অপসারণে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে তা ভাইরাল আকার ধারণ করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সুনাম ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি সমাজে ভুল বার্তা ছড়িয়ে দেয়। এ ধরনের কনটেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের পর অপরাধীদের আইপি ট্রেসিং, ডিভাইস ফরেনসিক বিশ্লেষণ, প্ল্যাটফর্মের সহযোগিতায় কনটেন্ট অপসারণ এবং প্রয়োজনে ফৌজদারি আইনে মামলা করার সুযোগ রয়েছে।

অপূর্বের ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিচয় অপব্যবহারের ঘটনা প্রথম নয়। ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে প্রায় সাত মাস যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান শেষে দেশে ফিরে নিজের একমাত্র সন্তানকে সারপ্রাইজ দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন তিনি। ভিডিওটি ছিল বাবা–ছেলের আবেগঘন মুহূর্তকেন্দ্রিক এবং পারিবারিক স্নেহ-ভালোবাসার প্রতিফলন। তবে ওই ভিডিওকে ঘিরে একদল ব্যবহারকারী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপূর্বর ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক অবস্থান এবং ভ্রমণ প্রসঙ্গকে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কে যুক্ত করে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার শুরু করে। সেই সময়ও অপূর্ব ভুয়া তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ এনে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাইবার ইউনিটের সহায়তায় ওই ঘটনাটি তদন্তে গড়ায় এবং একাধিক ফেসবুক প্রোফাইল বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল।

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, আগের ঘটনায় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার পরও পুনরায় একই কৌশলে অপূর্বর ছবি ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচারের চেষ্টা থেকে বোঝা যায়—সেলিব্রিটিদের ডিজিটাল পরিচয়কে কেন্দ্র করে অপপ্রচারের একটি সংঘবদ্ধ প্রবণতা সক্রিয় রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ব্যবহারকারী তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারেন না যে ফটোকার্ড বা ভিডিওতে উপস্থাপিত বক্তব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রকৃত মন্তব্য কিনা। ফলে বিভ্রান্তিকর তথ্য বিশ্বাসযোগ্যতার ছদ্মবেশে ছড়িয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে যাচাই (verification), উৎস বিশ্লেষণ (source tracing), কনটেন্টের মেটাডেটা পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক ব্যবহার, ভুয়া অ্যাকাউন্ট রিপোর্টিং এবং দ্রুত আইনি নোটিশ পাঠানোর মতো প্রতিরোধমূলক কৌশল আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের সংখ্যাগত বিস্তৃতি, রাজনৈতিক কনটেন্টের প্রতি আগ্রহ, দ্রুত শেয়ার করার প্রবণতা এবং ফটোকার্ডকেন্দ্রিক সংক্ষিপ্ত তথ্য বিশ্বাস করার মানসিকতা—এসব মিলিয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া রাজনৈতিক বক্তব্য ছড়ানোর ঘটনাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। তথ্যের উৎস যাচাই না করে কনটেন্ট শেয়ার করলে তা ভুল তথ্যের বিস্তৃতিতে ভূমিকা রাখে, যা আইনি দৃষ্টিতে সহায়তামূলক অপরাধ (abetment) হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সচেতনতা, প্ল্যাটফর্মের কঠোর নীতি প্রয়োগ এবং আইনের যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই প্রবণতা রোধ করা সম্ভব।

অভিযোগের প্রেক্ষাপটে অপূর্ব পুনরায় আইনগত প্রক্রিয়ায় যাওয়ার ইঙ্গিত দিলেও এখনো সুনির্দিষ্টভাবে কোন সংস্থা বা ইউনিটে অভিযোগ দায়ের করা হবে তা প্রকাশ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো ইতোমধ্যে নজরদারিতে আনা হয়েছে বলে সাইবার বিশ্লেষকদের ধারণা। ডিজিটাল পরিচয় অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালোভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে।

বিনোদন শীর্ষ সংবাদ