মহাখালীতে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনে অবৈধ বিলবোর্ড অপসারণে ডিএনসিসির অভিযান

মহাখালীতে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনে অবৈধ বিলবোর্ড অপসারণে ডিএনসিসির অভিযান

রাজধানী ডেস্ক

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনাল সংলগ্ন এলাকায় নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করে স্থাপিত অবৈধ বিলবোর্ড, পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন অপসারণে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে। শুক্রবার (২ জানুয়ারি) রাত ১১টার দিকে মহাখালী বাস টার্মিনাল এলাকায় এই অভিযান শুরু হয়, যা মধ্যরাত পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। অভিযানে নেতৃত্ব দেন ডিএনসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মারুফা বেগম নেলী। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গ করে লাগানো প্রচারসামগ্রী ও ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ স্থাপনা পর্যায়ক্রমে নগরীর অন্যান্য স্থান থেকেও অপসারণ করা হবে।

অভিযান শুরুর প্রাক্কালে মহাখালী বাস টার্মিনাল, মহাখালী ফ্লাইওভার সংলগ্ন অংশ, সড়কদ্বীপ, বাস স্টপেজ ও ফুটপাতের আশপাশে আচরণবিধি ভঙ্গকারী প্রচারসামগ্রী ও অবৈধ বিলবোর্ডের আধিক্য ছিল। এসব স্থাপনা দৃশ্যমানভাবে সড়ক নিরাপত্তা, জনচলাচল ও নগর নান্দনিকতায় বিঘ্ন সৃষ্টি করছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের পক্ষ থেকে মহাখালী ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক প্রচার কার্যক্রম চালানো হয়। এর একটি অংশ আচরণবিধি লঙ্ঘন করে অনুমোদনহীন বিলবোর্ড ও ব্যানার স্থাপনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল। নির্বাচনি আচরণবিধি অনুযায়ী, অনুমোদন ছাড়া নির্বাচনি পোস্টার, ব্যানার, বিলবোর্ড স্থাপন, দেয়াল লিখন, ফুটপাত বা সড়কদ্বীপ দখল করে প্রচারসামগ্রী লাগানো নিষিদ্ধ। প্রার্থীদের প্রচার কার্যক্রম নির্ধারিত আকার, স্থান ও সময়সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হয়। একইসঙ্গে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সড়ক নিরাপত্তা অবকাঠামো, বিদ্যুতের খুঁটি, ট্রাফিক সিগন্যাল, ফ্লাইওভার, ব্রিজ, ওভারপাস, আন্ডারপাস, মেট্রোরেল পিলারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কোনো প্রচারসামগ্রী ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই বিধি বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে থাকে।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মারুফা বেগম নেলী অভিযান চলাকালে সাংবাদিকদের জানান, অবৈধ বিলবোর্ড অপসারণের জন্য ডিএনসিসি পূর্বে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অনুমোদনহীন স্থাপনা সরিয়ে ফেলার নির্দেশ প্রদান করেছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রান্ত হলেও গণবিজ্ঞপ্তির নির্দেশনা মানা হয়নি। ফলে আইন অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অপসারণ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, এই অভিযানের লক্ষ্য কেবল নির্বাচনি প্রচারসামগ্রী অপসারণ নয়, বরং ঝুঁকিপূর্ণ ও অনুমোদনহীন বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন ও অন্যান্য স্থাপনা যা নগর নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার পরিপন্থী, সেগুলোও পর্যায়ক্রমে সরিয়ে ফেলা। ম্যাজিস্ট্রেট নেলী বলেন, মহাখালী ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে এমন স্থাপনা চিহ্নিত করে পরবর্তী ধাপেও উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো হবে। নগরীর বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও জনবহুল স্থানে অবৈধ বিলবোর্ড স্থাপনের প্রবণতা দীর্ঘদিনের। অনেক ক্ষেত্রে এসব স্থাপনা নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ না করায় ঝড়, ভারী বৃষ্টিপাত বা ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে তা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বিলবোর্ড ভেঙে পড়ে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে, যা নগর কর্তৃপক্ষকে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিলবোর্ড ব্যবস্থাপনায় কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে।

অভিযানের সময় অবৈধ বিলবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন লাগানোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক জরিমানার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব প্রচারসামগ্রী রাতের আঁধারে বা সংগঠিতভাবে স্থাপন করা হয়, যার দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি শনাক্ত করা কঠিন। এমনকি নোটিশ প্রদান করলেও তারা সাড়া দেয় না বা আদালতে উপস্থিত হয় না। ফলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে স্থাপনা সরিয়ে ফেলাই কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হয়। ডিএনসিসির আইন অনুযায়ী, অনুমোদনহীন বিলবোর্ড, ব্যানার বা সাইনবোর্ড স্থাপনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা বিজ্ঞাপন সংস্থাকে জরিমানা করার বিধান রয়েছে। তবে অভিযানের সময় সরাসরি কাউকে না পাওয়া গেলে বা শনাক্ত করা না গেলে অপসারণ কার্যক্রমকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনের বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী, জননিরাপত্তা ও নগর নান্দনিকতা রক্ষায় অবৈধ স্থাপনা অপসারণ ও জরিমানার ক্ষমতা সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ডিএনসিসি, জেলা প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের সমন্বয়ে পরিচালিত অভিযানে প্রচারসামগ্রী স্থাপনের দায়ী পক্ষ শনাক্ত হলে জরিমানা আদায়ও করা হয়। তবে মহাখালীর এই অভিযানে সরাসরি দায়ী পক্ষকে উপস্থিত না পাওয়ায় প্রধানত অপসারণ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে।

অবৈধ দোকান উচ্ছেদের প্রসঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেট নেলী জানান, ডিএনসিসি দিনের বেলায় নিয়মিতভাবে ফুটপাত, সড়কদ্বীপ ও সরকারি জমি দখল করে গড়ে ওঠা দোকান, ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা ও অন্যান্য দখলদার স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করে থাকে। ফুটপাত দখল ও অবৈধ দোকান স্থাপন ঢাকার যানজট ও জনচলাচলের বিঘ্নের অন্যতম প্রধান কারণ। সিটি করপোরেশনের তথ্যানুযায়ী, নগরীর বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও পুনরায় দখলের প্রবণতা অব্যাহত থাকায় ধারাবাহিক মনিটরিং ও এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম চলমান রাখা হয়। মহাখালী এলাকা ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন হাব হওয়ায় এখানে জনচলাচল ও যানবাহনের চাপ অত্যন্ত বেশি। ফলে আচরণবিধি লঙ্ঘনকারী প্রচারসামগ্রী ও অবৈধ বিলবোর্ড অপসারণ সড়ক নিরাপত্তা ও নগর শৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

এদিকে, নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনি প্রচারসামগ্রী ও বিলবোর্ড নিয়ন্ত্রণে নগর কর্তৃপক্ষ ও নির্বাচন কমিশনের সমন্বিত অভিযান গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের সময় নগরীর নান্দনিকতা, জননিরাপত্তা ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত না হলে তা ভোটার উপস্থিতি, যানজট ব্যবস্থাপনা ও সামগ্রিক পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষত মহাখালীর মতো জনবহুল ও কৌশলগত এলাকায় প্রচারসামগ্রী ব্যবস্থাপনায় নিয়ম মানা নিশ্চিত করা নির্বাচনি প্রক্রিয়ার একটি অপরিহার্য অংশ। ডিএনসিসির অভিযানের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবৈধ বিলবোর্ড স্থাপনের প্রবণতা কমে আসবে এবং জননিরাপত্তা ও নগর শৃঙ্খলা রক্ষায় তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযানে অপসারিত বিলবোর্ডগুলো অধিকাংশই সড়কের দৃশ্যমানতা আড়াল করে স্থাপন করা হয়েছিল, যা যানচালকদের মনোযোগ বিভ্রাট ও সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া, ফ্লাইওভার ও পরিবহন টার্মিনাল সংলগ্ন স্থানে বড় আকারের ব্যানার স্থাপন বাতাসের চাপে ছিঁড়ে পড়ে যানবাহন ও পথচারীদের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। নগর পরিকল্পনা ও বিজ্ঞাপন নীতিমালা অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের অনুমোদন সাপেক্ষে নির্ধারিত স্থানে সীমিত আকারে বিজ্ঞাপন স্থাপনের বিধান থাকলেও অনুমোদনহীন স্থাপনা অপসারণে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে। মহাখালীতে এই অভিযান সিটি করপোরেশনের সেই আইনি ক্ষমতারই প্রয়োগ।

ডিএনসিসির পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, অভিযানের পর মহাখালী এলাকায় অবৈধ বিলবোর্ড ও ব্যানারের স্থানগুলো মনিটরিংয়ের আওতায় রাখা হবে, যাতে পুনরায় অনুমোদনহীন প্রচারসামগ্রী স্থাপন করা না হয়। একইসঙ্গে, নগরীর অন্যান্য বাণিজ্যিক ও পরিবহনকেন্দ্রিক এলাকায়ও পর্যায়ক্রমে আচরণবিধি লঙ্ঘনকারী প্রচারসামগ্রী ও ঝুঁকিপূর্ণ বিলবোর্ড অপসারণে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হবে। নগর শৃঙ্খলা ও সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্বাচনকালীন আচরণবিধি বাস্তবায়নে এই ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও চলমান থাকবে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।

রাজধানী শীর্ষ সংবাদ