রাজনীতি ডেস্ক
রাজশাহী, ৩ জানুয়ারি ২০২৬ (+০৬০০): জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহীর ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ৩৮টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। তবে একজন প্রার্থী দুটি আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করায় কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৭ জনে। দাখিলকৃত হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৩৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩৪ জনই স্নাতক, স্নাতকোত্তর, পেশাগত ডিগ্রি বা সমমানের উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন, যা মোট প্রার্থীর প্রায় ৯২ শতাংশ। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার তফসিল অনুযায়ী, রাজশাহীতে মনোনয়নপত্র যাচাই–বাছাই অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৩ জানুয়ারি।
নির্বাচনের মাঠে উচ্চশিক্ষিত প্রার্থীর এই আধিক্য জাতীয় প্রেক্ষাপটে পেশাগত বৈচিত্র্য ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রভাবকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। প্রার্থীদের মধ্যে চারজন চিকিৎসক রয়েছেন, যারা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ে ছয়টি আসনের মধ্যে তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে রাজশাহী-২ (সদর) আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন চিকিৎসক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর এবং রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে মনোনীত হয়েছেন চিকিৎসক আব্দুল বারী সরদার। একই রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী–তানোর) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন চিকিৎসক আল সাআদ। নাগরিক ঐক্যের ব্যানারে রাজশাহী-২ আসনে চিকিৎসক মোহাম্মদ সামছুল আলম মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ স্থানীয় পর্যায়ে সেবা খাতের প্রত্যাশা ও নীতি-ভাবনায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
হলফনামা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ছয়টি আসনের মধ্যে মোট ২৭ জন প্রার্থী স্নাতক, স্নাতকোত্তর বা সমমানের একাডেমিক সনদধারী। এর মধ্যে ৮ জনের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক বা সমমানের, এবং বাকি ১৯ জনের যোগ্যতা স্নাতকোত্তর, পেশাগত ডিগ্রি বা বিশেষায়িত উচ্চতর সনদ। দুই আসনে প্রার্থী হওয়া শাহাবুদ্দিন—যিনি রাজশাহী-২ ও রাজশাহী-৩ (পবা–মোহনপুর) আসনে স্বতন্ত্র পরিচয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন—একাডেমিক যোগ্যতায় এমবিএ ডিগ্রিধারী। তিনি জাতীয় পার্টির সাবেক নেতা ছিলেন, তবে এবারের নির্বাচনে কোনো দলীয় প্রতীক ছাড়া স্বতন্ত্র হিসেবে অংশ নিচ্ছেন। একই সঙ্গে ব্যবসা প্রশাসনের উচ্চতর ডিগ্রিধারী প্রার্থীর উপস্থিতি নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ পরিকল্পনা ও স্থানীয় উন্নয়ন কৌশল নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্র বিস্তৃত করেছে।
প্রার্থীদের পেশাগত পরিচয়ে আইনজীবী ও আইনি শিক্ষার প্রতিনিধিত্বও উল্লেখযোগ্য। ৩৭ জন প্রার্থীর মধ্যে চারজন আইনজীবী উচ্চতর আইনি ডিগ্রি নিয়ে অংশ নিচ্ছেন। রাজশাহী-২ আসনে এলডিপির প্রার্থী মো. ওয়াহেদুজ্জামান এলএলবি ডিগ্রিধারী এবং একই আসনে এবি পার্টির মনোনীত প্রার্থী সাঈদ নোমানও এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। রাজশাহী-৪ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী তাজুল ইসলাম খান একাডেমিক যোগ্যতায় এম এ (স্নাতকোত্তর) ও এলএলবি সম্পন্ন করেছেন। রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া–দুর্গাপুর) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী রায়হান কাওসার এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেছেন, যা আইনি উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি সনদ। এসব প্রার্থীর অংশগ্রহণ নির্বাচনী বিতর্কে আইন, ন্যায়বিচার, সংবিধান, প্রশাসনিক সংস্কার ও আইনি কাঠামোর আধুনিকায়ন সংক্রান্ত প্রত্যাশাকে প্রাধান্য দিচ্ছে।
দলীয় প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত পরিচয়েও বৈচিত্র্য রয়েছে। বিএনপির ছয়টি আসনে মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে পাঁচজনই উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন এবং একজন মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। রাজশাহী-১ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। রাজশাহী-২ আসনে মিজানুর রহমান মিনু স্নাতক (পাস কোর্স) সম্পন্ন করেছেন। রাজশাহী-৩ আসনে শফিকুল হক মিলন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে ডি এম ডি জিয়াউর রহমান স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া–দুর্গাপুর) আসনে নজরুল ইসলাম স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। রাজশাহী-৬ (বাঘা–চারঘাট) আসনে বিএনপির প্রার্থী আবু সাঈদ চাঁদ এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে সামরিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে একাডেমিক উচ্চশিক্ষার সমন্বয় স্থানীয় ভোটারদের কাছে নীতি-পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার প্রশ্নে বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাজশাহীর নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলীয় পরিচয়ের বাইরে নিম্ন-মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রার্থীও রয়েছেন, যদিও তাদের সংখ্যা তুলনামূলক কম। রাজশাহী-৬ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী আব্দুস সালাম সুরুজ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। রাজশাহী-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী কৃষক লীগের নেত্রী ও উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান হাবিবা বেগম উচ্চ-মাধ্যমিক (এইচএসসি) স্তর সম্পন্ন করেছেন। রাজশাহী-৩ আসনে আরেকজন প্রার্থী এইচএসসি এবং ছয় আসনে একজন করে প্রার্থী অষ্টম শ্রেণি, এসএসসি ও এইচএসসি স্তরের যোগ্যতার। এ ছাড়া অষ্টম শ্রেণি, এসএসসি, এইচএসসি ও একাডেমিক ডিগ্রিধারী প্রার্থীর সমন্বিত অংশগ্রহণ নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে বিস্তৃত করেছে।
নির্বাচনী তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র যাচাই–বাছাই ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত চলমান রয়েছে। রাজশাহীতে যাচাই–বাছাই অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৩ জানুয়ারি। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি। আপিল নিষ্পত্তি করা হবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি। ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সুযোগ পাবেন। ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন হবে। প্রচার-প্রচারণা শেষে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ১২ ফেব্রুয়ারি।
রাজশাহীর ছয়টি আসনে প্রার্থীদের মধ্যে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত ডিগ্রির উপস্থিতি ভোটারদের প্রত্যাশা, স্থানীয় নীতি-পরিকল্পনা ও প্রার্থী বাছাইয়ের মানদণ্ডে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্বকে স্পষ্ট করেছে। একই সঙ্গে চিকিৎসক ও আইনজীবী পেশার প্রতিনিধিত্ব নির্বাচনী নীতি–আলোচনায় স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সংস্কার, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রত্যাশাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এই পরিসংখ্যান নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শিক্ষাগত ও পেশাগত বৈচিত্র্যের প্রভাবকে আরও দৃশ্যমান করেছে।


