আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী ভেনেজুয়েলা প্রজাতন্ত্রে একটি ব্যাপক সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে এবং ওই দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। যদিও ভেনেজুয়েলার সরকার এসব দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে তা সামরিক আগ্রাসন ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন দাবি করেছে।
গত শনিবার (৩ জানুয়ারি) ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। ভেনেজুয়েলার সরকার ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেশব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে করা হচ্ছে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। একই সঙ্গে দেশটির সরকারি পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক শক্তির হস্তক্ষেপের ফল, যদিও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প টেলিকমিউনিকেশন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত এক পোস্টে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে ভেনেজুয়েলা এবং দেশটির নেতা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ওপর একটি বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। অভিযানে মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে আটক করে দেশটির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।” তিনি আরও জানান, এই অপারেশনটি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বয়ে পরিচালিত হয়েছে এবং পরে এ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।
ট্রাম্প বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় ফ্লোরিডায় মার-এ-লাগো রিসর্টে সংবাদ সম্মেলনের কথা ঘোষণা করেছেন, যেখানে এই অভিযান ও পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত বিবৃতি দেওয়ার কথা রয়েছে। তিনি তাঁর পোস্টে লিখেছেন, “এই উদ্যোগের ফলে ভেনেজুয়েলার বর্তমান সরকার ও তার নেতৃত্বের অবৈধ কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আইনগত ও ন্যায্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে।”
মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ২০১৩ সাল থেকে ভেনেজুয়েলার নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্বাচন ব্যবস্থায় অনিয়ম ও অর্থনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তোলার অভিযোগ এনে আসছে। মাদুরোর রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে এবং তাঁর অনেক সমালোচক তাঁকে “অবৈধ”ভাবে ক্ষমতার দখলদার হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। তবে মাদুরোর সমর্থকগণ দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশী হস্তক্ষেপের বিপক্ষে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেয়।
ভেনেজুয়েলার সরকার যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক হস্তক্ষেপকে তীব্রভাবে নিন্দা জানিয়ে এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, “যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে চরম সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন। আমরা এই ঘটনার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং বিশ্ববাসীর কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করছি।” তারা আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তারা এই পরিস্থিতির ন্যায়পাতীয় সমাধান দাবি করবে।
উভয় পক্ষই নিজেদের বক্তব্যে পরস্পরকে দায়ী করায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর এ অঞ্চলে নজরদারি বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ও মাদুরোর আটক সম্পর্কিত কোনো স্বাধীন, তৃতীয় পক্ষের তাৎক্ষণিক তথ্য যাচাই পাওয়া যায়নি। এছাড়া কোনো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বা পর্যবেক্ষক মিশনও এখন পর্যন্ত এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেনি। পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্লেষকরা বলছেন, এরকম পরিস্থিতিতে স্বচ্ছতা না থাকলে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে এবং তা আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতে পারে।
ভেনেজুয়েলার সাধারণ জনগণ দেশটির বিভিন্ন শহরে মিডিয়া রিপোর্ট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সরকারি নির্দেশনার আলোকে পরিস্থিতির কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হচ্ছে। কারাকাসের মতো বড় শহরে লোকজন বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির শব্দে আতঙ্কিত হওয়া সহ বিভিন্ন অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সরকারি কর্তৃপক্ষ এক পর্যায়ে নিহিত স্বার্থ ও নিরাপত্তার কথা বলে কিছু সড়ক ও যোগাযোগ কেন্দ্রিক এলাকা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, মধ্য আমেরিকার এই ভূমিকম্প potential আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক কেমনভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করবে। বিশেষ করে তেলসম্পদে সমৃদ্ধ এই দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা পরিবেশ ও বাজার স্থিতিশীলতায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক ইতোমধ্যেই টানাপড়েনপূর্ণ ছিল এবং এখন tensions আরও জটিল আকার নিতে পারে।
সাম্প্রতিক এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাশিয়া, চীনা মত কিছু দেশ ইতিমধ্যেই তাদের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেছে। তারা আন্তর্জাতিকভাবে শান্তি, সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আইনি ও নৈতিক অবস্থানকে সমর্থন জানাচ্ছে এমন সংকেতও রয়েছে।
বর্তমানে পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞ সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, উত্তেজনা প্রশমিত করতে কূটনৈতিক উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও স্বচ্ছ তথ্য বিনিময় অপরিহার্য। তারা মনে করেন, সংঘাতের সম্ভাব্যতা কমাতে সকল পক্ষকে সংলাপের টেবিলে বসাতে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে।


