আইন আদালত ডেস্ক
ঢাকা, ৩ জানুয়ারি ২০২৬: ট্রাভেল এজেন্সি খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও সুশাসন জোরদারে বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ সংশোধন করে সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করেছে। এতে ট্রাভেল এজেন্সি-সংক্রান্ত আইন বা বিধিমালা লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১ (এক) বছর কারাদণ্ড, অনধিক ১০ (দশ) লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অধ্যাদেশে অফলাইন ও অনলাইন—উভয় ধরনের ট্রাভেল এজেন্সির নিবন্ধন, নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনা, ব্যাংক গ্যারান্টি, আর্থিক লেনদেনের মাধ্যম, বার্ষিক প্রতিবেদন দাখিল, সনদ নবায়ন ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত নতুন বিধান সংযোজন করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব ড. হাফিজ আহমেদ চৌধুরীর স্বাক্ষরে অধ্যাদেশটি জারি করা হয়। অধ্যাদেশের ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ১ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে প্রণীত নিম্নে উল্লিখিত অধ্যাদেশটি জনসাধারণের জ্ঞাতার্থে প্রকাশ করা হইল।’ সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর সংবিধানের ৯৩ (১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি এই অধ্যাদেশ জারি করেন। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, সংসদ ভেঙে থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতির নিকট সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে, ট্রাভেল এজেন্সি খাতে আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রয়েছে।
অধ্যাদেশ প্রণয়নের পটভূমিতে গ্রাহকসেবা, টিকিটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, আকাশপথে পরিবহন খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ যাত্রীসহ অভিবাসীকর্মীদের বিদেশ গমনে হয়রানি নিবারণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা-ই থাকুক না কেন, ট্রাভেল এজেন্সি নিবন্ধন, নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা সংক্রান্ত বিষয়ে এই আইনের বিধানাবলি প্রাধান্য পাবে। ফলে বিদ্যমান অন্য আইনের সঙ্গে কোনো বিধানের সাংঘর্ষিক ব্যাখ্যা বা প্রয়োগ-সংক্রান্ত জটিলতার ক্ষেত্রে সংশোধিত ট্রাভেল এজেন্সি আইনই কার্যকর বিধান হিসেবে বিবেচিত হবে।
অধ্যাদেশে নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় নতুন তথ্য-সংযোজনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের নামে ট্রাভেল এজেন্সি থাকলে এজেন্সির নাম, নিবন্ধন নম্বর, মালিকের পাসপোর্ট নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, উত্তরাধিকার সনদ, অর্থের উৎসসহ চূড়ান্ত উপকারভোগী মালিকের (ইউবিও/Ultimate Beneficial Owner) নাম, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য এবং স্বার্থ নিরপেক্ষ লেনদেন (Arm’s Length Transaction) অনুযায়ী ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার তথ্য দাখিল করতে হবে। এই বিধান ট্রাভেল এজেন্সির মালিকানা কাঠামোর স্বচ্ছতা, অর্থের উৎস যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সত্তার প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্তকরণ সহজ করবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
ব্যাংক গ্যারান্টি সংক্রান্ত বিধানেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। অফলাইন ট্রাভেল এজেন্সির ক্ষেত্রে ব্যাংক গ্যারান্টির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ (দশ) লক্ষ টাকা। অপরদিকে, অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সির জন্য ব্যাংক গ্যারান্টির পরিমাণ হবে ১ (এক) কোটি টাকা। এই ভিন্নতর গ্যারান্টি কাঠামো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম-ভিত্তিক ব্যবসার বৃহত্তর লেনদেনের পরিমাণ, গ্রাহক-সংখ্যা ও ঝুঁকি বিবেচনায় নির্ধারণ করা হয়েছে বলে অধ্যাদেশে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক গ্যারান্টি ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে গ্রাহকের অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
টিকিট বিক্রয় ও লেনদেন-সংক্রান্ত বিধান লঙ্ঘন প্রতিরোধে অধ্যাদেশে কঠোর শর্ত সংযোজন করা হয়েছে। আকাশপথে ভ্রমণের সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির নিকট থেকে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ, মিথ্যা প্রলোভন প্রদর্শন, প্রতারণা, অন্য কোনো ট্রাভেল এজেন্সির কাছ থেকে টিকিট ক্রয়-বিক্রয়, এজেন্সির ঠিকানা ব্যবহার করে রিক্রুটিং এজেন্ট হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা এবং সরকার নির্ধারিত আর্থিক মাধ্যম ব্যতীত লেনদেন করা যাবে না—মর্মে হলফনামা দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব বিধান লঙ্ঘন করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং শাস্তিযোগ্য বিধান প্রযোজ্য হবে।
ডিজিটাল টিকেট ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল অবৈধভাবে ব্যবহার, এয়ারলাইন্সের প্যাসেঞ্জার সার্ভিস সিস্টেমের লগইন আইডি ও পাসওয়ার্ড শেয়ার বা বিতরণ, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, ভুয়া বুকিং (False Booking/‘ভধষংব নড়ড়শরহম’), অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, তৃতীয় দেশ থেকে টিকিট ক্রয়-বিক্রয়, গ্রুপ বুকিংয়ে যাত্রীর তথ্য পরিবর্তন, অভিবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে সমষ্টিগত মূল্য পরিশোধে অনিয়ম, এয়ারলাইন্স বা এর কর্মচারীর সঙ্গে স্বার্থ-সংঘাতমূলক সম্পৃক্ততা, টিকিটে এজেন্সির নাম-নম্বর-মূল্য উল্লেখ না থাকা—এসব কর্মকাণ্ড অধ্যাদেশে সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অনিয়ম রোধে এ বিধানগুলো যুক্ত হওয়ায় বিমান টিকিটের মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও প্রতারণা প্রতিরোধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিবন্ধন কর্তৃপক্ষকে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারির ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। প্রতারণা, দুর্নীতি বা এতদসংক্রান্ত আবশ্যকীয় ক্ষেত্রে আকস্মিক দেশত্যাগ রোধে নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় সাধনপূর্বক ট্রাভেল এজেন্সির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা (Travel Ban) জারি করবে। এই বিধান এজেন্সি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত এবং তদন্ত চলাকালে দেশত্যাগজনিত আইনি জটিলতা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
অধ্যাদেশে ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর জন্য বার্ষিক আর্থিক বিবরণীসহ সার্বিক কার্যক্রমের প্রতিবেদন নির্ধারিত পদ্ধতিতে সরকারের নিকট দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দাখিলকৃত প্রতিবেদন সন্তোষজনক বিবেচিত হলে নিবন্ধন সনদ প্রতি ৩ (তিন) বছর পর নবায়নযোগ্য হবে। তবে জনস্বার্থে, শুনানি ব্যতীত সরকার সাময়িকভাবে কোনো ট্রাভেল এজেন্সির নিবন্ধন সনদ স্থগিত করতে পারবে—এমন নতুন উপধারাও যুক্ত করা হয়েছে। ফলে অনিয়ম-সংক্রান্ত অভিযোগ বা তথ্য সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হলে সরকার তাৎক্ষণিকভাবে সনদ স্থগিতের ব্যবস্থা নিতে পারবে।
সংশোধিত অধ্যাদেশটি ‘বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ নামে অভিহিত হবে এবং তা অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে। এতে ট্রাভেল এজেন্সি খাতে নিয়ন্ত্রক কাঠামো অধিকতর সংহত, ঝুঁকি-সামঞ্জস্যপূর্ণ ও জবাবদিহিমূলক রূপ পেয়েছে বলে আইন-সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।


