রাজধানীতে ফেজ-২ ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’: ২৪ ঘণ্টায় ৯৮ জন গ্রেপ্তার

রাজধানীতে ফেজ-২ ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’: ২৪ ঘণ্টায় ৯৮ জন গ্রেপ্তার

ডেস্ক

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধ দমনে চলমান ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এর দ্বিতীয় ধাপের (ফেজ-২) আওতায় গত ২৪ ঘণ্টায় পাঁচটি থানা এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ৯৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। শনিবার (৩ জানুয়ারি) ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। অভিযান পরিচালিত থানাগুলো হলো—শেরেবাংলা নগর, মিরপুর মডেল, যাত্রাবাড়ী, দারুস সালাম ও রূপনগর থানা।

ডিএমপির তথ্যমতে, সর্বোচ্চ ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। মিরপুর মডেল থানায় ১১ জন, যাত্রাবাড়ী থানায় ১২ জন, দারুস সালাম থানায় ১৪ জন এবং রূপনগর থানায় ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে নিয়মিত মামলার আসামি, আদালতের পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি, মাদক, চুরি, ছিনতাই, দাঙ্গা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, অস্ত্র আইনে অভিযুক্তসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত সন্দেহভাজনরা রয়েছেন।

উপ-পুলিশ কমিশনার তালেবুর রহমান শেরেবাংলা নগর থানার বরাত দিয়ে জানিয়েছেন, শুক্রবার (২ জানুয়ারি) শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ থানা এলাকার অপরাধপ্রবণ স্পট—বস্তি, রেললাইন সংলগ্ন এলাকা, ফুটপাত ও জনবহুল বাণিজ্যিক অঞ্চলসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দিনব্যাপী অভিযান চালায়। অভিযানে নিয়মিত মামলা ও পরোয়ানাভুক্তসহ ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক যাচাইয়ে তাদের বিরুদ্ধে মাদক কারবার, পেশাদার চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং-সংশ্লিষ্ট সহিংসতা, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ও সন্ত্রাসী তৎপরতার অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।

একই দিন মিরপুর মডেল থানা পুলিশ মিরপুর এলাকার বিভিন্ন অপরাধপ্রবণ অঞ্চলে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৫০০ গ্রাম গাঁজা ও দুটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত মাদকদ্রব্য ও আলামত জব্দ করে থানায় নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক সরবরাহ নেটওয়ার্ক, চোরাই মোবাইল ফোনের বাজার ও ছিনতাই চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ মূলত ২০২৫ সালের শেষ দিকে ডিএমপি কর্তৃক শুরু হওয়া একটি সমন্বিত বিশেষ অপরাধবিরোধী অভিযান, যার লক্ষ্য রাজধানীতে সংগঠিত অপরাধ, মাদক কারবার, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, সাইবার-সহায়তাপ্রাপ্ত অপরাধ, কিশোর গ্যাং-সংশ্লিষ্ট সহিংসতা, পেশাদার চুরি-ছিনতাই, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার ও অপরাধের ঝুঁকিপূর্ণ স্পট চিহ্নিত করে তা নিয়ন্ত্রণে আনা। প্রথম ধাপের (ফেজ-১) অভিযানে রাজধানীর ২০-এর বেশি থানা এলাকায় শতাধিক অভিযুক্ত গ্রেপ্তার, বিপুল মাদকদ্রব্য ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের তথ্য পাওয়া যায়। এর ধারাবাহিকতায় ফেজ-২-এ অধিক সংখ্যক থানা ও অপরাধপ্রবণ এলাকা অন্তর্ভুক্ত করে গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান জোরদার করা হয়েছে।

রাজধানীতে অপরাধের সাম্প্রতিক প্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাদক কারবার, কিশোর গ্যাং-সংশ্লিষ্ট সহিংসতা, ছিনতাই ও সাইবার-সহায়তাপ্রাপ্ত অপরাধ গত কয়েক বছরে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার বস্তি, গণপরিবহন টার্মিনাল, মার্কেট এলাকা, রেললাইন সংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল, বহুতল ভবনের নির্মাণাধীন সাইট, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চ টার্মিনাল, রাতের বিনোদনকেন্দ্র সংলগ্ন এলাকা ও জনবহুল সড়কে মাদক কারবার ও ছিনতাই চক্র সক্রিয় থাকার তথ্য নিয়মিতভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসে। এছাড়া আদালতের পরোয়ানা নিয়ে দীর্ঘদিন পলাতক থাকা আসামিদের উপস্থিতি ও স্থানীয় অপরাধী চক্রের পুনর্গঠনের ঝুঁকি অপরাধের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

ডিএমপির অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও সাবেক তদন্ত কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এ ধরনের সমন্বিত বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে অপরাধী চক্রের তৎপরতা তাৎক্ষণিকভাবে হ্রাস পায়, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার নিশ্চিত হয় এবং অপরাধপ্রবণ স্পটে পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানোর ফলে স্থানীয় অপরাধ নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষ অভিযানগুলো অপরাধীদের মধ্যে আইনি চাপ বৃদ্ধি, অপরাধের অর্থনৈতিক উৎসে আঘাত, মাদক সরবরাহ চেইন বিঘ্নিতকরণ, অপরাধ সংগঠনে ব্যবহৃত প্রযুক্তিগত আলামত উদ্ধার এবং স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধীদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তবে অভিযানের কার্যকারিতা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হলে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি, সাইবার অপরাধ শনাক্তে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, মাদক নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত সরবরাহ-চেইন মনিটরিং, অপরাধপ্রবণ এলাকায় সামাজিক প্রতিরোধ, অপরাধীদের আর্থিক উৎস অনুসন্ধান ও আইনি প্রক্রিয়ায় দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল নিশ্চিত করা অপরিহার্য বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ডিএমপির চলমান অভিযানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান মামলা, আদালতের পরোয়ানা ও নতুন করে প্রাপ্ত আলামতের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উদ্ধারকৃত মাদক, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য আলামত ফরেনসিক ও তদন্ত বিশ্লেষণের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিটে পাঠানো হচ্ছে। অভিযানে জব্দ আলামতগুলোর সূত্র ধরে রাজধানীর মাদক সরবরাহ নেটওয়ার্ক, চোরাই পণ্য বাজার ও ছিনতাই চক্রের বিস্তৃত কাঠামো শনাক্তে তদন্ত চলমান রয়েছে।

ডিএমপি জানিয়েছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত, দাঙ্গা-সহিংসতা প্রতিরোধ, মাদক, অস্ত্র ও ছিনতাই দমনে এই বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং পর্যায়ক্রমে রাজধানীর অন্যান্য থানায়ও অভিযান বিস্তৃত করা হবে। ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এর মতো সমন্বিত অপরাধবিরোধী অভিযানগুলো রাজধানীর অপরাধ কাঠামোয় তাৎক্ষণিক চাপ সৃষ্টি করলেও, অপরাধ দমনের স্থায়ী সুফল নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক পুলিশি নজরদারি, দ্রুত তদন্ত সমাপ্তি ও আইনি ব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞরা।

শীর্ষ সংবাদ