ধর্ম ডেস্ক
গাজীপুরের টঙ্গীর তুরাগতীরে তাবলিগ জামাত বাংলাদেশ শুরায়ি নেজামের অধীনে শুরায়ি (শূরা-নিয়ন্ত্রিত) নেজামের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত তিন দিনব্যাপী খুরুজের জোড় (খুরুজের উদ্দেশ্যে দিকনির্দেশনামূলক সমাবেশ) রোববার সকাল ৮টা ৪৪ মিনিটে আখেরি মোনাজাতের (সমাপনী দোয়া) মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়েছে। তুরাগ নদের তীরসংলগ্ন ইজতেমা ময়দানে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে দেশ-বিদেশের মুসল্লিদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য।
সমাপনী দিনে ভোর থেকেই ইজতেমা ময়দান অভিমুখে মুসল্লিদের আগমন শুরু হয়। ফজরের নামাজের পর পাকিস্তানের শীর্ষ মুরুব্বি (বর্ষীয়ান তাবলিগ ব্যক্তিত্ব) মাওলানা উবায়দুল্লাহ খুরশিদ হেদায়েতি বয়ান (দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য) প্রদান করেন। খুরুজে অংশ নিতে ইচ্ছুক জামাতগুলোর উদ্দেশে আল্লাহর পথে দাওয়াত, আমল, সফরের শিষ্টাচার, সময় ব্যবস্থাপনা, জামাতি শৃঙ্খলা, ইবাদতের গুরুত্ব, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আচরণবিধি, এবং সফরকালে ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের মৌলিক দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হয় বয়ানে। এ বয়ানের মূল লক্ষ্য ছিল খুরুজে বের হতে প্রস্তুত জামাতগুলোর জন্য আধ্যাত্মিক, সাংগঠনিক ও বাস্তবিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করা।
বয়ান শেষে সকাল ৮টা ২৮ মিনিটে দোয়া শুরু হয়ে ৮টা ৪৪ মিনিটে শেষ হয়। দোয়া পরিচালনা করেন বাংলাদেশের তাবলিগের শীর্ষ মুরুব্বি মাওলানা মোহাম্মদ জুবায়ের। দোয়া চলাকালে ময়দানজুড়ে ‘আমিন’ ধ্বনি উচ্চারিত হয়, যা সমবেত মুসল্লিদের ধর্মীয় আবেগ ও একাগ্রতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে পরিলক্ষিত হয়। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, দোয়ায় অংশ নেন প্রায় ৭২টি দেশ থেকে আগত আড়াই হাজার বিদেশি মেহমান (তাবলিগ প্রতিনিধি) এবং দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত বিপুলসংখ্যক মুসল্লি।
সমাবেশের সমাপনী অংশে ৭২ দেশের বিদেশি মেহমানদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, থাইল্যান্ড, দাগেস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফ্রান্স, কানাডা, বেলজিয়াম, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, ইতালি, জাপান, সৌদি আরব, তুরস্ক, কাতার, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে, কুয়েত, ওমান, জর্ডান, তিউনিসিয়া, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, কিরগিজস্তান, মিয়ানমার, জাম্বিয়া, মোজাম্বিক, সোমালিয়া, সোমালিল্যান্ড, ভারত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন অঞ্চলের তাবলিগ জামাত অংশ নেয়। বাংলাদেশ থেকেও ৬৪ জেলা থেকে আগত জামাতগুলো উপস্থিত ছিল। সমাবেশ থেকে মোট প্রায় ১৫০০ জামাত খুরুজে অংশ নিতে চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে আল্লাহর পথে সফরে বের হয়। এর মধ্যে বিদেশি জামাত ও দেশীয় জামাত মিলিয়ে আনুমানিক ১৫০০ জামাত থাকলেও আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরাসরি খুরুজের উদ্দেশ্যে মাঠ থেকে বের হওয়া জামাতের সংখ্যা প্রায় ১৫০০ এবং সদস্যসংখ্যা বিবেচনায় মোট বের হওয়া জামাতের অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ১৫০০ জামাতের কাঠামোতেই হিসাব করা হয়েছে।
খুরুজ তাবলিগ জামাতের একটি মৌলিক কার্যক্রম, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জামাতি কাঠামোয় সংগঠিত হয়ে মুসল্লিরা দাওয়াত ও ধর্মীয় আমলের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন অঞ্চল ও দেশে সফরে বের হন। তাবলিগ জামাতের শুরায়ি নেজাম মূলত শূরা-ভিত্তিক পরিচালন কাঠামো, যেখানে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক নির্দেশনা পরামর্শভিত্তিক কাঠামোয় নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের কার্যক্রমে একাধিক ধারার উপস্থিতি থাকলেও এই আয়োজন শুরায়ি নেজামের অধীনেই সম্পন্ন হয়েছে, যা আয়োজকদের বক্তব্যে স্পষ্ট করা হয়েছে।
সমাবেশস্থলে অংশগ্রহণকারীদের যাতায়াত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, স্বেচ্ছাসেবী তদারকি, চিকিৎসা সহায়তা কেন্দ্র, বিদেশি মেহমানদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাপনা, এবং জামাতগুলোর নিবন্ধন, রওয়ানা ব্যবস্থাপনা ও দিকনির্দেশনামূলক সেশন সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করা হয়। যদিও সমাবেশটি মূলত ধর্মীয় ও সাংগঠনিক প্রস্তুতির উদ্দেশ্যে আয়োজিত, তবে এত বৃহৎ জনসমাগম যেকোনো গণপরিবহন, স্থানীয় প্রশাসনিক সমন্বয়, স্বেচ্ছাসেবী ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুতি ও নগর পরিকল্পনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব-সমন্বয় উদাহরণ হিসেবেও বিবেচিত হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে একসঙ্গে এত জামাতের রওয়ানা কার্যক্রম সমন্বয় করতে যে সাংগঠনিক কাঠামো ও সময়নিষ্ঠা প্রয়োজন, তা তাবলিগ জামাতের কার্যক্রমে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিলক্ষিত।
এদিকে, আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের জাতীয় নির্বাচনের পর ৫৯তম বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্ব ইজতেমা বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ, যা সাধারণত দুই পর্বে অনুষ্ঠিত হয় এবং তাবলিগ জামাতের বিভিন্ন ধারার মুরুব্বিরা পর্বভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় তা পরিচালনা করেন। তবে এবারের সম্ভাব্য ৫৯তম বিশ্ব ইজতেমা কবে কোন কাঠামো ও পর্বে অনুষ্ঠিত হবে, তা এখনো চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা হয়নি। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ইজতেমা আয়োজনের পরিকল্পনা উল্লেখ করার মাধ্যমে মূলত সময়রেখার একটি সম্ভাব্য কাঠামো নির্দেশ করা হয়েছে, যদিও এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এই সমাবেশের কার্যক্রম বা বক্তব্যে যুক্ত করা হয়নি।
বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম বহু দশক ধরে ধর্মীয় দাওয়াত, আত্মশুদ্ধি, ইবাদত, জামাতি শৃঙ্খলা ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে পরিচালিত হয়ে আসছে। এই সমাবেশও তারই ধারাবাহিক অংশ, যেখানে মূলত খুরুজে অংশ নিতে প্রস্তুত জামাতগুলোর জন্য ধর্মীয়, সাংগঠনিক ও বাস্তবিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। সমাবেশ থেকে বের হওয়া জামাতগুলো পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা, গ্রামাঞ্চল, শহর এবং বিদেশে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত দাওয়াত ও ধর্মীয় আমলের কার্যক্রম পরিচালনা করবে।


