আবহাওয়া ডেস্ক
আজ সোমবার (৫ জানুয়ারি ২০২৬) ভোর ৪টা ৪৭ মিনিটে সিলেটসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝারি থেকে শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। কম্পন কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হলেও ভোররাতের নীরবতায় তা অধিকতর স্পষ্টভাবে অনুভূত হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ২, যা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)–এর প্রাথমিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের ধিং এলাকায়। ভূকম্পনের কেন্দ্রস্থল ছিল ভূগর্ভের ৩৫ কিলোমিটার গভীরে। ভূমিকম্পের কেন্দ্রের অবস্থান ভূপৃষ্ঠ থেকে তুলনামূলক গভীরে হওয়ায় বাংলাদেশে তা ধ্বংসাত্মক পর্যায়ে না পৌঁছালেও সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং রাজধানী ঢাকার কিছু অংশে কম্পন অনুভূত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সিলেট নগরীতে ভূমিকম্পের কম্পন ছিল অপেক্ষাকৃত তীব্র। নগরীর জিন্দাবাজার, সুবিদবাজার, শাহজালাল উপশহর, আখালিয়া, মিরাবাজার, টিলাগড়, শিবগঞ্জ, দক্ষিণ সুরমা ও আশপাশের এলাকায় বসবাসকারীরা জানিয়েছেন, কম্পনের সময় ভবন হালকা দুলে ওঠে এবং ঘরের আসবাবপত্রে কম্পনের প্রভাব অনুভূত হয়। ভোররাতে অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে থাকায় ভূকম্পনের পরপরই অনেকে আতঙ্কিত হয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে আসেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি এবং অবকাঠামোগত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির তথ্যও নিশ্চিত হয়নি।
বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে সক্রিয় ভূমিকম্প–প্রবণ অঞ্চলের অংশ হওয়ায় দেশের উত্তর, উত্তর–পূর্ব এবং দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চল প্রায়ই পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর ভূমিকম্পের প্রভাব অনুভব করে। বিশেষ করে সিলেট বিভাগ ইন্ডিয়ান ও ইউরেশিয়ান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের নিকটবর্তী হওয়ায় এ অঞ্চল তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আসামের ধিং ও নাগাঁও অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই সিসমিক কার্যক্রমে সক্রিয়, যেখানে প্লেট সঞ্চালনজনিত চাপ জমে ভূকম্পন সৃষ্টি হয় এবং তা বাংলাদেশ পর্যন্ত অনুভূত হতে পারে।
দেশে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সাধারণত ৪.৫–৫.৯ মাত্রার ভূমিকম্প মাঝারি হিসেবে ধরা হয়, ৬.০–৬.৯ শক্তিশালী এবং ৭.০ বা তদূর্ধ্ব ভূমিকম্প ধ্বংসাত্মক হিসেবে বিবেচিত। আজকের ভূমিকম্প মাঝারি মাত্রার হলেও ভোররাতের সময় অনুভূত হওয়ায় জনমনে আতঙ্কের মাত্রা ছিল বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গভীরতার কারণে এ ভূমিকম্পে শক্তির ক্ষয় বেশি হয়েছে, ফলে বাংলাদেশে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি তুলনামূলক কম ছিল।
গত বছরের ১০ ডিসেম্বর মধ্যরাতে সিলেটে পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে দুই দফা ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল। ওই দিন রাত ২টা ২০ মিনিট ৩১ সেকেন্ডে প্রথম কম্পন এবং ২টা ২৫ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে দ্বিতীয় কম্পন রেকর্ড করা হয়। সে সময়ের ভূমিকম্প দুটির মাত্রা তুলনামূলক কম থাকলেও স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দুই দফা কম্পন অনুভূত হওয়ায় তা সিলেট অঞ্চলের সিসমিক সক্রিয়তার বিষয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে তখন বলা হয়েছিল, ওই কম্পনগুলোর উৎসও ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলের সিসমিক বেল্টে জমে থাকা চাপের ফল।
বাংলাদেশে অতীতের ভূমিকম্প–সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮৯৭ সালের গ্রেট আসাম আর্থকোয়েক (মাত্রা ৮.০–৮.৭), ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প (৭.৬), ১৯৩০ সালের ধুবড়ি ভূমিকম্প (৭.১) এবং ১৯৫০ সালের গ্রেট আসাম–তিব্বত ভূমিকম্প (৮.৬) ছিল এ অঞ্চলের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্প, যার প্রভাব তৎকালীন পূর্ববঙ্গেও অনুভূত হয়েছিল। যদিও আজকের ভূমিকম্প ঐতিহাসিক বড় ভূমিকম্পগুলোর তুলনায় অনেক কম শক্তিসম্পন্ন, তবুও এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকির বাইরে নয়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি নির্ভর করে মূলত জনঘনত্ব, ভবনের কাঠামোগত মান, গভীরতা, উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব এবং ভূমিকম্প–পরবর্তী প্রস্তুতির ওপর। বিশেষ করে সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে বহুতল ভবনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং শহরাঞ্চলে অপরিকল্পিত নির্মাণ ভূমিকম্প ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। ভবন নির্মাণে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুসরণ বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবায়ন পর্যায়ে এখনও ঘাটতি রয়েছে, যা ভূমিকম্প–পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ভূকম্পনের সময় ভবনের ভেতরে থাকলে দরজার ফ্রেম, টেবিল বা শক্ত কাঠামোর নিচে আশ্রয় নেওয়া এবং জানালা ও ঝুলন্ত বস্তু থেকে দূরে থাকা সবচেয়ে নিরাপদ। ভবন থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে লিফট ব্যবহার না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়, কারণ ভূমিকম্পের সময় লিফট আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ভূমিকম্প–পরবর্তী সময়ে গ্যাসলাইন, বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং ভবনের ফাটল দ্রুত পরীক্ষা করা জরুরি, যাতে পরবর্তী দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।
বাংলাদেশের সিলেট বিভাগসহ উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলো ভূমিকম্প ঝুঁকিতে থাকার কারণে এসব এলাকায় দুর্যোগ প্রস্তুতি, স্কুল–কলেজ ও জনসমাগমস্থলে ভূমিকম্প–বিষয়ক মহড়া, অবকাঠামোর সিসমিক রেট্রোফিটিং (ভবন শক্তিশালীকরণ) এবং জরুরি উদ্ধার–সামর্থ্য বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। যদিও আজকের ভূমিকম্পে তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে ভবিষ্যতে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি সিসমিক প্রস্তুতি ও জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
ইউএসজিএস জানিয়েছে, ভূমিকম্পটি আসামের সিসমিক বেল্টে জমে থাকা টেকটোনিক চাপের কারণে সৃষ্টি হয়েছে, যা উত্তর–পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশ অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ প্লেট সঞ্চালনের ফল। ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো পরবর্তী ২৪–৭২ ঘণ্টা আফটারশক (পরবর্তী কম্পন) পর্যবেক্ষণ করবে, কারণ মাঝারি ভূমিকম্পের পর ছোট আফটারশকের সম্ভাবনা থাকে। তবে আফটারশকের মাত্রা সাধারণত মূল ভূমিকম্পের তুলনায় কম শক্তিসম্পন্ন হয়।
বাংলাদেশে ভূমিকম্প–পরবর্তী প্রস্তুতি ও উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ফায়ার সার্ভিস, সশস্ত্র বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবী উদ্ধার দল ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলো নিয়মিত সক্ষমতা উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে অতীত ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা ও ভূতাত্ত্বিক অবস্থান বিবেচনায় স্থানীয় প্রশাসন, নগর পরিকল্পনাবিদ ও অবকাঠামো উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে ভবিষ্যৎ ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।


