রাজধানী ডেস্ক
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের জন্য নির্ধারিত ছয়টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ঘন কুয়াশার কারণে রানওয়ে দৃশ্যমান না হওয়ায় নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় অবতরণ করতে ব্যর্থ হয়ে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করেছে। গতকাল সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত সময়সীমায় ফ্লাইটগুলোর গতিপথ পরিবর্তন করা হয় এবং কুয়াশা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটার পর পর্যায়ক্রমে ফ্লাইটগুলো পুনরায় ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে।
ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক হাফিজ আহমদ জানিয়েছেন, গতকাল ঘন কুয়াশার কারণে ঢাকার রানওয়ে দৃশ্যমানতার মাত্রা নিরাপদ অবতরণের জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম মানের নিচে নেমে যাওয়ায় ফ্লাইট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ বিকল্প হিসেবে সিলেট বিমানবন্দরে অবতরণের সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি বলেন, ‘ঘন কুয়াশার কারণে ঢাকায় অবতরণ করতে না পারা ছয়টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ওসমানী বিমানবন্দরে অবতরণ করেছিল। এ ছাড়া আমাদের নিজস্ব নির্ধারিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনাও অব্যাহত ছিল। কুয়াশা কমে গেলে ফ্লাইটগুলো ঢাকায় ফিরে যায়।’
বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, রানওয়ের দৃশ্যমানতা সাধারণত ফ্লাইট অবতরণের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সূচক। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, দৃশ্যমানতা ৫৫০ মিটারের নিচে নেমে গেলে বা রানওয়ে ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ (আরভিআর) নির্ধারিত নিরাপদ সীমার নিচে থাকলে ফ্লাইট অবতরণ ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। গতকাল ঢাকায় দৃশ্যমানতার এই সূচক ২০০–৪০০ মিটারের মধ্যে ওঠানামা করছিল বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের বরাতে জানা যায়, যা নিরাপদ অবতরণের জন্য অপর্যাপ্ত। ফলে বিমানবন্দরে ফ্লাইট অবতরণ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয় এবং বিকল্প অবতরণ পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শীত মৌসুমে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে জানুয়ারির প্রথমার্ধ পর্যন্ত সময়ে উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে ঘন কুয়াশা নিয়মিত দৃশ্যমানতার সংকট সৃষ্টি করে। কুয়াশার ঘনত্ব, তাপমাত্রা হ্রাস, বাতাসের আর্দ্রতা বৃদ্ধি এবং ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি বায়ুস্তরের স্থিতিশীলতার কারণে রানওয়ে ও অবতরণ সংকেত যন্ত্রাংশের দৃশ্যমানতায় বিঘ্ন ঘটে। বিশেষত রাত থেকে সকাল পর্যন্ত সময়ে কুয়াশার ঘনত্ব সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। গতকাল ঢাকায় মধ্যরাত পর্যন্ত কুয়াশা পরিস্থিতি গুরুতর পর্যায়ে ছিল এবং সকাল ৯টা পর্যন্ত দৃশ্যমানতা সংকটে ফ্লাইট ওঠানামায় সতর্কতা বজায় রাখা হয়।
ফ্লাইট গতিপথ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত সাধারণত বিমান পরিচালনা কর্তৃপক্ষ, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) ও ফ্লাইট ক্যাপ্টেনের সম্মিলিত ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে গৃহীত হয়। এই প্রক্রিয়ায় জ্বালানি সক্ষমতা, নিকটবর্তী বিকল্প বিমানবন্দরের সক্ষমতা, রানওয়ে দৈর্ঘ্য, নেভিগেশন সিস্টেম, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সুবিধা এবং জরুরি অবতরণের জন্য প্রয়োজনীয় সাপোর্ট সার্ভিস বিবেচনায় নেওয়া হয়। ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৯ হাজার ফুটের বেশি হওয়ায় বড় উড়োজাহাজ অবতরণের সক্ষমতা রাখে, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় নেভিগেশন, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও যাত্রী সহায়তা সুবিধা থাকায় এটি বিকল্প অবতরণের জন্য উপযোগী বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
জরুরি অবতরণ সফলভাবে পরিচালনার জন্য ওসমানী বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল, ফায়ার সার্ভিস, মেডিকেল টিম, ইমিগ্রেশন ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করে। গতকাল রাতেই অতিরিক্ত ফ্লাইটের চাপ সামাল দিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো পূর্ব-প্রস্তুত বিকল্প অবতরণ প্রটোকল সক্রিয় করে। ফ্লাইট অবতরণের পর যাত্রীদের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হয়। যদিও এটি স্বল্প সময়ের জন্য কার্যকর ছিল, তবে যাত্রীদের বিমানবন্দরে অপেক্ষার সময়, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা ও সংযোগ ফ্লাইট সূচিতে প্রভাব পড়তে পারে—এমন বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের জন্য বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা কার্যকর করে।
কুয়াশা পরিস্থিতি উন্নতির পর দৃশ্যমানতার সূচক নিরাপদ সীমায় ফিরে এলে ছয়টি ফ্লাইটই পুনরায় ঢাকায় ফিরে যায়। এই সময়ে যাত্রীদের সংযোগ ফ্লাইট, ইমিগ্রেশন ও ব্যাগেজ পুনঃব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য প্রভাব কমিয়ে আনতে বিমানবন্দর ও সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন অপারেশন বিভাগ দ্রুত সমন্বয় সাধন করে। ফ্লাইট ফেরার পর শাহজালাল বিমানবন্দরে স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় চালু হয় এবং সকাল থেকে ফ্লাইট ওঠানামা নিয়মিত সূচিতে পরিচালিত হয়।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা জানান, ঘন কুয়াশায় দৃশ্যমানতা সংকট মোকাবিলায় উন্নত যন্ত্র-নির্ভর অবতরণ ব্যবস্থা (ইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম—আইএলএস) ক্যাটাগরি-২ ও ক্যাটাগরি-৩ প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, যেখানে দৃশ্যমানতা ৫০–৩০০ মিটার পর্যন্ত নেমে গেলেও যন্ত্রের সাহায্যে অবতরণ সম্ভব। তবে এর জন্য রানওয়ে, আলো ব্যবস্থা, বিমান ও পাইলট—সব ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত ও প্রশিক্ষণ মান পূরণ বাধ্যতামূলক। শাহজালাল বিমানবন্দরে আইএলএস ক্যাটাগরি-২ প্রযুক্তি সক্রিয় থাকলেও ঘন কুয়াশার চরম পরিস্থিতিতে পাইলটের ভিজ্যুয়াল নিশ্চিতকরণ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিকল্প অবতরণ কৌশল প্রয়োগ করা হয়।
বাংলাদেশে শীত মৌসুমে ফ্লাইট দিক পরিবর্তন ও বিকল্প অবতরণ নতুন ঘটনা নয়। ২০২৪–২৫ শীত মৌসুমেও ঢাকায় দৃশ্যমানতা সংকটে একাধিক ফ্লাইট চট্টগ্রাম ও সিলেটে বিকল্প অবতরণ করেছিল। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ব্যবস্থায় এটি স্বীকৃত নিরাপত্তা কৌশল, যার মূল লক্ষ্য যাত্রী, উড়োজাহাজ ও ক্রুদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। প্রতিকূল আবহাওয়া পরিস্থিতিতে বিকল্প বিমানবন্দরগুলোকে প্রস্তুত রাখা, এটিসি ও গ্রাউন্ড বিভাগের সমন্বয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক যন্ত্র-নির্ভর অবতরণ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ—এসব বিষয়ে ধারাবাহিক উন্নয়ন ভবিষ্যতে দৃশ্যমানতা সংকটজনিত বিঘ্ন কমিয়ে আনতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
গতকাল ঘন কুয়াশার কারণে ফ্লাইট দিক পরিবর্তনের ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি এবং জরুরি অবতরণ প্রক্রিয়া নিরাপদভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ায় বিকল্প অবতরণ সফলভাবে পরিচালনা করায় সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে সমন্বিত জরুরি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার একটি কার্যকর নজির স্থাপন করেছে।


