জেলা প্রতিনিধি
গাজীপুর মহানগরীতে ১১ বছরের সন্তানের সামনে এক যুবদল নেতাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহত আবু নাহিদ ওরফে হাসান নাহিদ (৩৫) হাড়িনাল উত্তরপাড়া এলাকার বাসিন্দা মহন মিয়ার ছেলে এবং গাজীপুর সদর মেট্রো থানা যুবদলের নেতা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি স্থানীয় পর্যায়ে যুবদলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন।
ঘটনাটি ঘটে গত ২৮ ডিসেম্বর রাত সোয়া ৯টার দিকে হাড়িনাল বাজার এলাকায়। সেদিন রাতে আবু নাহিদ ১১ বছর বয়সী সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বাজারে অবস্থান করছিলেন। এ সময় একদল দুর্বৃত্ত অতর্কিত হামলা চালিয়ে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। হামলার পর স্থানীয়রা তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। রোববার (৪ জানুয়ারি) দুপুরে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
গাজীপুর সদর মেট্রো থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঘটনার পর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। ইতোমধ্যে দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং অন্য আসামিদের গ্রেফতারে একাধিক টিম অভিযান পরিচালনা করছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ও হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে, তবে তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার রাতে হামলাকারীরা সংঘবদ্ধভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। বাজারের মতো জনবহুল এলাকায় সন্তানের উপস্থিতিতে এই হামলা চালানোর ঘটনা স্থানীয় জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, জনবহুল স্থানে প্রকাশ্যে নৃশংস হামলার ঘটনাগুলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষত, শিশু প্রত্যক্ষদর্শীর সামনে সহিংসতার ঘটনাগুলো মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে এবং তা সামাজিক পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে নিরাপত্তা নজরদারি, দ্রুত তদন্ত, এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
ঘটনার পর যুবদল ও স্থানীয় রাজনৈতিক পরিসরে উত্তেজনার আভাস পাওয়া গেলেও পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং ঘটনাটিকে কেবল হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্ত করা হচ্ছে। আইন অনুযায়ী, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে মামলার তদন্ত ও গ্রেফতার কার্যক্রম পরিচালিত হবে বলে পুলিশ পুনর্ব্যক্ত করেছে।
এদিকে, এই হত্যাচেষ্টার ঘটনার পরদিন গাজীপুর মহানগর শ্রমিক দল নেতা নজরুল ইসলামকে প্রধান আসামি করে থানায় একটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশের ভাষ্যমতে, মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে এবং আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আইন অনুযায়ী, অভিযোগের প্রমাণ মিললে আসামিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে হত্যা মামলায় নজরুল ইসলামের সম্পৃক্ততা নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুটি মামলার যোগসূত্র, হামলার উদ্দেশ্য, এবং অপরাধীদের সাংগঠনিক বা ব্যক্তিগত বিরোধের দিকগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হাড়িনাল বাজার এলাকায় রাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সীমিত থাকে এবং পর্যাপ্ত আলোর অভাব রয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি গ্রহণ করছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সংগৃহীত ডিজিটাল আলামত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ মামলার অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে হত্যা মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া, অপরাধে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার, পরিকল্পনাকারীদের শনাক্তকরণ, এবং হামলায় অংশগ্রহণকারীদের ভূমিকা নির্ধারণ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পাবে। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত দ্রুত শেষ করে আইনানুগ সময়ের মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে।
শিশুর সামনে সহিংসতার এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দেশে শিশু সুরক্ষা, জননিরাপত্তা, এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধ বিষয়ে নতুন করে আলোচনার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্থানীয় পর্যায়ে সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে কমিউনিটি পুলিশিং, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বৃদ্ধি, অপরাধপ্রবণ এলাকায় টহল জোরদার, এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড কমিয়ে আনা সম্ভব।


