নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল, গাজীপুরে সাতজন গ্রেপ্তার

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল, গাজীপুরে সাতজন গ্রেপ্তার

গাজীপুর সদর এলাকায় ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক সংলগ্ন স্থানে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল বের করলে পুলিশি অভিযানে অন্তত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রোববার (৪ জানুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে গাজীপুর সদর থানার ভোগড়া বাইপাস ও আশপাশের এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। মিছিল চলাকালে মহাসড়কের একটি অংশে যানবাহনের গতি ধীর হয়ে পড়লেও দ্রুত পুলিশি হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকেলে হঠাৎ মহাসড়কের পূর্বপাশের সার্ভিস লেন ও সংলগ্ন খালি স্থানে ছাত্রলীগের ২০–২৫ জনের একটি দল জড়ো হয়। তারা সংগঠনের সাবেক শীর্ষ নেতাদের নামে এবং ‘নেতা মোদের শেখ মুজিব’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই সার্ভিস লেন থেকে মহাসড়কের দিকে অগ্রসর হয়ে মিছিল শুরু করে এবং মহাসড়কের একটি অংশ প্রদক্ষিণ করে পুনরায় সার্ভিস লেনে ফিরে আসার চেষ্টা করে। মিছিলটি কোনো পূর্বঘোষণা বা অনুমতি ছাড়াই পরিচালিত হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ও কৌতূহল সৃষ্টি হয়। মিছিলকারীদের অনেকের মুখে মাস্ক, কারও কারও মাথায় ক্যাপ ও শরীরে সংগঠনসংশ্লিষ্ট প্রতীকী পোশাক থাকলেও কোনো ব্যানার বা মাইক ব্যবহার করা হয়নি, যা ঝটিকা মিছিলের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) অপরাধ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। নিষিদ্ধ ঘোষণার পর থেকে সংগঠনটির ব্যানারে প্রকাশ্য রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা বেআইনি হিসেবে গণ্য হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ ধরনের কার্যক্রম প্রতিরোধে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায়, রোববারের ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গাজীপুর সদর থানা পুলিশের টহল দল ও অতিরিক্ত ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মিছিল শুরু হওয়ার ৫–৭ মিনিটের মধ্যেই পুলিশের প্রথম দল সেখানে উপস্থিত হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মিছিলকারীরা দ্রুত ছত্রভঙ্গ হয়ে আশপাশের গলি, বাজার এলাকা ও বাসস্ট্যান্ডমুখী সড়কের দিকে পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ ধাওয়া দিয়ে ঘটনাস্থল ও সংলগ্ন এলাকা থেকে সাতজনকে আটক করে। আটককৃতদের কাছ থেকে কোনো অস্ত্র, বিস্ফোরক বা উসকানিমূলক লিফলেট উদ্ধার না হলেও তাদের সংগঠনটির স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মী হিসেবে প্রাথমিক শনাক্ত করা হয়েছে। পুলিশ গ্রেপ্তারকৃতদের নাম–পরিচয় যাচাই, সাংগঠনিক সম্পৃক্ততার গভীরতা নিরূপণ এবং ঘটনার পেছনে কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা, অর্থায়ন বা নির্দেশনার উৎস আছে কি না— তা অনুসন্ধান করছে।

জিএমপির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চেষ্টা, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের নামে কার্যক্রম পরিচালনা এবং অনুমতি ছাড়া মহাসড়কে মিছিল বের করার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আটককৃতরা বর্তমানে থানায় হেফাজতে রয়েছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন ও দণ্ডবিধির প্রাসঙ্গিক ধারায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের আদালতে সোপর্দ করা হবে।

আইন বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো সংগঠন নিষিদ্ধ ঘোষণার পর তার ব্যানারে কার্যক্রম পরিচালনা করা রাষ্ট্রীয় আইনে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ এটি জনশৃঙ্খলা, নাগরিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের প্রতি অমান্যতার শামিল। অনুমতি ছাড়া মহাসড়কে মিছিল যানচলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং দ্রুত ভিড় জমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে। যদিও রোববারের মিছিলটি স্বল্পস্থায়ী ছিল, তথাপি এটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে পরিচালিত হওয়ায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।

ঘটনার পর সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মহাসড়ক ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়। যানচলাচল স্বাভাবিক রাখতে হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়। গাজীপুর সদর থানার ওসি (তদন্ত) জানান, ভবিষ্যতে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের নামে প্রকাশ্য কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা প্রতিরোধে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় কমিউনিটি পুলিশিং টিম, পরিবহন শ্রমিক সংগঠন, বাজার কমিটি ও নাগরিক প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল–ঘেঁষা এবং জাতীয় মহাসড়ক–নির্ভর জেলা হওয়ায় এখানে রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক সহিংসতার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে ঝটিকা জমায়েত, মিছিল বা স্লোগান প্রদানের ঘটনায় স্থানীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়ার নজির রয়েছে। ফলে রোববারের মিছিলটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে প্রাথমিকভাবে বিবেচনা করা হলেও এর সম্ভাব্য বিস্তার রোধে সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের নামে কোনো ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা প্রতিহত করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাংবিধানিক ও আইনি দায়িত্ব। এর অংশ হিসেবে দ্রুত হস্তক্ষেপ, ধাওয়া ও গ্রেপ্তার পরিচালিত হয়েছে এবং চলমান আইনি প্রক্রিয়ায় ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে।

শীর্ষ সংবাদ সারাদেশ