জাতীয় ডেস্ক
জাতীয় নির্বাচন একটি সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও ভোটপ্রক্রিয়ার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচনকে ঘিরে পুলিশ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে বলে পুনর্ব্যক্ত করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
রোববার (৪ জানুয়ারি) রাজধানীর রাজারবাগে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ট্রেনিং একাডেমিতে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আয়োজিত ‘নির্বাচনী দায়িত্বে পুলিশের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। কর্মশালাটি পুলিশ সদস্যদের নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, সংকট ব্যবস্থাপনা, জননিরাপত্তা, আচরণগত শৃঙ্খলা এবং নির্বাচনকালীন সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনের সময় মাঠে দায়িত্ব পালনকারী প্রতিটি পুলিশ সদস্য জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষতা ও পেশাদার আচরণ নিশ্চিত করা পুলিশের জন্য মৌলিক শর্ত। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া— নির্বাচনপূর্ব, নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়— আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা এবং জনস্বার্থ রক্ষা করা পুলিশের প্রধান অগ্রাধিকার।
বক্তব্যে তিনি পুলিশ সদস্যদের সততা, দায়িত্বশীলতা ও পেশাদারিত্বের সর্বোচ্চ মান বজায় রাখার নির্দেশ দেন। নির্বাচনের আগে ভোটকেন্দ্র নিরাপত্তা পরিকল্পনা, সম্ভাব্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ, নির্বাচনী সরঞ্জাম পরিবহন নিরাপত্তা, ভোটার উপস্থিতি নির্বিঘ্ন রাখা, গুজব প্রতিরোধ, জনসমাগম ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে উপদেষ্টা স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেন।
নির্বাচনকালীন সময়ে ভোটকেন্দ্র ও এর আশপাশে নিরাপত্তা বলয় তৈরি, ভোটার ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত, বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ, আচরণগত শৃঙ্খলা বজায় রাখা, সহিংস পরিস্থিতি এড়াতে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গ্রহণ, তাৎক্ষণিক তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত এবং ভোটপ্রক্রিয়া যাতে কোনো পক্ষের প্রভাবমুক্ত থাকে— সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখতে বলা হয়। পাশাপাশি ভোটগ্রহণ শেষে ব্যালট ও নির্বাচনী সামগ্রী সংরক্ষণ, ফলাফল ঘোষণা-পরবর্তী নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং যে কোনো আইনগত অভিযোগ বা সহিংসতার আশঙ্কা মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।
কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম, ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী, পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ডেভেলপমেন্ট) সরদার নুরুল আমিন, ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অ্যাডমিন) মো. সরওয়ারসহ মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশিক্ষণ সমন্বয়কারী ও ব্যাচ-অংশগ্রহণকারী মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা কর্মশালায় অংশ নেন।
প্রশিক্ষণ কর্মশালার পটভূমি ও অগ্রগতি তুলে ধরে জানানো হয়, গত বছরের ৫ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী এই কর্মশালা ডিএমপির ১৯টি ভেন্যুতে ২৮টি ব্যাচে পরিচালিত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ২২টি ব্যাচের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে ১৮ হাজার ১৫০ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য অংশ নিয়ে প্রশিক্ষণ উত্তীর্ণ হয়েছেন। কর্মশালার আওতায় সম্ভাব্য মোট ২৪ হাজার ৩৪২ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে বাকি ব্যাচগুলোর প্রশিক্ষণ চলমান।
এই প্রশিক্ষণের অন্যতম লক্ষ্য হলো— নির্বাচনকেন্দ্রিক নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন, জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে আস্থা বৃদ্ধি, পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থার ব্যবহার, সাইবার ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো অপতথ্য প্রতিরোধ, ভোটার সুরক্ষা ও সহায়তা, নির্বাচনকালীন আইনগত কাঠামো সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা এবং নির্বাচন পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বিত ভূমিকা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পুলিশ ছাড়াও আনসার, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীসহ একাধিক বাহিনী দায়িত্ব পালন করে থাকে। এক্ষেত্রে সমন্বিত কমান্ড, তথ্য আদান-প্রদান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার নিরাপত্তা মূল্যায়ন, ভোটার প্রবেশ ও প্রস্থান ব্যবস্থাপনা, নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, প্রার্থীদের নিরাপত্তা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় যৌথ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। কর্মশালায় এসব সমন্বয় কাঠামো, নির্বাচন নিরাপত্তা আইন ও মাঠ বাস্তবতার আলোকে পুলিশ সদস্যদের করণীয় নির্ধারণ করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনকেন্দ্রিক পুলিশের নিরপেক্ষ আচরণ জনআস্থার অন্যতম প্রধান সূচক। নির্বাচনকালীন সময়ে যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে ভোটার অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পায় এবং নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ও আস্থাশীল রাখতে পুলিশের নিরপেক্ষতা, আচরণগত শৃঙ্খলা, আইনি দায়িত্বপালন এবং পেশাগত দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা কর্মশালার সমাপ্তি পর্বে বলেন, নির্বাচন ঘিরে জনগণের নিরাপত্তা, ভোটারদের অবাধ অংশগ্রহণ এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়া রক্ষায় পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে হবে সর্বোচ্চ পেশাদার মান বজায় রেখে, যাতে নির্বাচন প্রভাবমুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে সম্পন্ন হয়।


