রাজনীতি ডেস্ক
দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর বগুড়ায় সফরে আসছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আগামী ১১ জানুয়ারি তিনি বগুড়া সফর করবেন। জেলা বিএনপির দুই দায়িত্বশীল নেতা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সফর ঘিরে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন দেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা তুঙ্গে। তারেক রহমানের সফর বিএনপির নির্বাচনী কৌশল, সাংগঠনিক সংহতি এবং উত্তরাঞ্চলের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
দলীয় সূত্র অনুযায়ী, বগুড়া সফর শেষে তারেক রহমান রংপুরে যাবেন। সেখানে শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করার কথা রয়েছে। এছাড়া চলতি মাসের ২০ জানুয়ারির দিকে সিলেট সফরেরও পরিকল্পনা রয়েছে তার। পর্যায়ক্রমিক এই সফরগুলো দলের সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠন এবং নির্বাচনী বার্তা তৃণমূলে পৌঁছে দেওয়ার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়িতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পৈতৃক ভিটা অবস্থিত। এই পারিবারিক যোগসূত্রের কারণে তারেক রহমানের সঙ্গে বগুড়ার ঐতিহাসিক ও আবেগঘন সম্পর্ক বিদ্যমান। ১৯৩৬ সালে বাগবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান, যিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপাঠকারী হিসেবে জাতীয় ইতিহাসে অনন্য স্থান অধিকার করেন। ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর থেকে বগুড়া উত্তরাঞ্চলে দলটির রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
বগুড়া-৬ (সদর) এবং ঢাকা-১৭ আসন থেকে তারেক রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণাও চলমান নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি জাতীয় নির্বাচনে তারেক রহমানের প্রথম সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বগুড়া-৬ আসনটি বিএনপির ঐতিহ্যবাহী দুর্গ হিসেবে পরিচিত; ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আসনটিতে বিএনপি জয় লাভ করে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন বর্জনের কারণে এই ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের বগুড়া সফর দলের জন্য তিনটি প্রধান দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ— (১) উত্তরাঞ্চলে সাংগঠনিক নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয়, (২) নির্বাচনী প্রচারের কৌশলগত বার্তা প্রদান, এবং (৩) পারিবারিক ও ঐতিহাসিক বন্ধনের মাধ্যমে জনসমর্থন সংহতকরণ। বিশেষত, বগুড়া ও রংপুর অঞ্চলে দলের কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে এই সফর ইতোমধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
বগুড়ায় বিএনপির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০০৭ সালের ১/১১ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারেক রহমান গ্রেপ্তার হন এবং পরবর্তীতে ২০০৮ সালে জামিনে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান। এরপর থেকে তিনি সেখান থেকেই দলের কৌশলগত নির্দেশনা দিয়ে আসছেন। দীর্ঘ এই অনুপস্থিতি সত্ত্বেও দলের নীতিনির্ধারণে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।
বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশাহ জানিয়েছেন, ১১ জানুয়ারি তারেক রহমানের বগুড়া সফরের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। ৫ জানুয়ারি এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যাবে। স্থানীয় পর্যায়ে সফর উপলক্ষে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে, যদিও বিস্তারিত সফরসূচি এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
বগুড়া সফরের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে রাজনীতিবিদ, স্থানীয় প্রশাসন এবং নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। নির্বাচন সামনে রেখে যে কোনো বড় রাজনৈতিক সফরে জনসমাগম, যান চলাচল, নিরাপত্তা প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। বগুড়া শহর এবং সদর ও আশপাশের উপজেলাগুলোতে সফরের দিন বিপুল জনসমাগম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বগুড়া জেলা বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, উত্তরাঞ্চলের রাজনীতিতে বগুড়ার ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে কৌশলগত। বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী ও সিলেটের সফরগুলোকে একত্রে উত্তরাঞ্চল–কেন্দ্রিক রাজনৈতিক বার্তা এবং নির্বাচনী সংহতি তৈরির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তারেক রহমানের বগুড়ার সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক ছাড়াও জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, দলের প্রতিষ্ঠাকালীন সমর্থন ভিত্তি এবং শহীদ রাষ্ট্রপতির পৈতৃক ভিটার অবস্থান— সব মিলিয়ে এই সফরটি প্রতীকী, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত, আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে তার অংশগ্রহণ সফরের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এই সফরের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ বিরতির পর তারেক রহমান প্রথমবারের মতো বগুড়ার রাজনীতিতে সরাসরি উপস্থিত হতে যাচ্ছেন, যা বিএনপির উত্তরাঞ্চলীয় সাংগঠনিক পুনরুজ্জীবন ও নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।


