রাজনীতি ডেস্ক
কুড়িগ্রাম জেলার কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহীর মনোনয়নপত্র দ্বৈত নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত নথি ঘাটতির কারণে বাতিল ঘোষণা করেছেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা অন্নপূর্ণা দেবনাথ। ৫ জানুয়ারি রোববার দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত মনোনয়নপত্র বাছাই-পরবর্তী পুনঃযাচাই শুনানিতে এ সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। প্রার্থীর যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন অনুমোদন বা প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো গ্রহণযোগ্য দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারায় নির্বাচন বিধিমালা অনুসারে তাঁর মনোনয়ন অবৈধ ঘোষণা করা হয়।
রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২ জানুয়ারি একই আসনের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাছাই কার্যক্রমে সালেহীর মনোনয়ন স্থগিত রাখা হয়েছিল। স্থগিতাদেশের ভিত্তি ছিল—প্রার্থী তাঁর দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অস্পষ্টতা ও জটিলতা। ওইদিন শুনানি শেষে প্রার্থীকে নাগরিকত্ব ত্যাগের চূড়ান্ত বৈধতা প্রমাণের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার নির্দেশনা মেনে রোববার দুপুরে মাহবুবুল আলম তাঁর প্রতিনিধি ও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে নথিপত্রসহ রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে উপস্থিত হন।
বাছাই শুনানির কার্যক্রমে অন্নপূর্ণা দেবনাথ তাঁর অফিস কক্ষ থেকে সম্মেলন কক্ষে এসে আসন গ্রহণ করেন। প্রার্থী ও তাঁর প্রতিনিধিদের কাছে যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদনের অনুমোদন, প্রত্যাহার বা বাতিলাদেশের চূড়ান্ত সরকারি নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নপত্র চাওয়া হয়। প্রার্থী এ বিষয়ে যুক্তরাজ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে ইস্যুকৃত কোনো প্রামাণ্য দলিল উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হন। শুনানিতে দলীয় নেতারা বক্তব্য রাখতে চাইলে রিটার্নিং কর্মকর্তা নির্বাচন আইন অনুযায়ী আপিলের সুযোগ গ্রহণের পরামর্শ দেন এবং আর কোনো আলোচনায় না গিয়ে সম্মেলন কক্ষ ত্যাগ করে নিজ দপ্তরে চলে যান।
বাংলাদেশের নির্বাচন আইন ও নাগরিকত্ব বিধিমালা অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে হলে তাঁকে বাংলাদেশের একক নাগরিকত্ব ধারণ করতে হয়। দ্বৈত নাগরিকত্বধারীদের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের চূড়ান্ত দালিলিক প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আবেদন গ্রহণ ও অনুমোদনের লিখিত সনদ অথবা নাগরিকত্ব ত্যাগ কার্যকর হওয়ার সরকারি গেজেট/সমমান নথি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। নির্ধারিত সময়ে এসব নথি জমা না দিলে মনোনয়নপত্র বাতিলের বিধান রয়েছে। এই আইনি কাঠামো নাগরিকত্বের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বিদেশি আনুগত্য বা দ্বৈত দায়বদ্ধতার প্রশ্নে সাংবিধানিক শর্ত পূরণের লক্ষ্যে প্রণীত।
মনোনয়ন বাতিল ঘোষণার পরপরই সম্মেলন কক্ষের ভেতরে ও বাইরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, সিদ্ধান্ত ঘোষণার মুহূর্ত থেকে জামায়াত প্রার্থীর অন্তত ২০০ কর্মী ও সমর্থক জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ও করিডোরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাঁরা রিটার্নিং কর্মকর্তার অফিস কক্ষের দরজায় ধাক্কাধাক্কি করেন এবং উচ্চস্বরে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বিক্ষোভ চলাকালে একজন দলীয় নেতা রিটার্নিং কর্মকর্তাকে দ্রুত বদলির হুমকি দেন, যা প্রশাসনের নজরে আসে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয় এবং অতিরিক্ত উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। সরকারি দপ্তরে হুমকি প্রদান, দায়িত্ব পালনকালে কর্মকর্তাকে বাধা দেওয়া বা অশোভন আচরণ ফৌজদারি ও নির্বাচন আইন উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহী বলেন, ‘মনোনয়নপত্র অধিকতর যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রিটার্নিং কর্মকর্তা নথি যাচাইয়ে পর্যাপ্ত সময় বা সুযোগ না দিয়ে আইনগত ব্যাখ্যা বিবেচনা না করেই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি উচ্চ আদালতে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে মনোনয়নপত্র বৈধ করার চেষ্টা করব।’ নির্বাচন কমিশনের বিধান অনুসারে, রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল দায়েরের সুযোগ রয়েছে এবং আপিল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের প্রার্থীদের নির্বাচনী বৈধতা অনিশ্চিত অবস্থায় থাকে।
রোববারের বিক্ষোভ ও হুমকির বিষয়ে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা অন্নপূর্ণা দেবনাথ সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তবে নাগরিকত্ব ও আপিল-সংক্রান্ত ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, ‘আপিলের মাধ্যমে প্রার্থীরা বৈধতা পেলে নির্বাচনী কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার এখতিয়ার আমাদের নেই। নির্বাচন আইন ও সাংবিধানিক শর্ত পূরণের বিষয়ে যেসব নথি বাধ্যতামূলক, সেগুলোর অনুপস্থিতিতে বিধি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দিতে হয়।’ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা নির্বাচনকালীন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা; ব্যক্তিগত বিবেচনা বা পক্ষপাতের সুযোগ এখানে নেই।
কুড়িগ্রাম-৩ আসনটি রাজনৈতিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং অতীতে এ অঞ্চলে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গেছে। মনোনয়ন বাতিলের ঘটনায় জামায়াতের প্রার্থিতা আপিল-পর্যায়ে ঝুলে থাকায় আসনটিতে দলীয় কৌশল ও ভোটের সমীকরণে পরিবর্তন আসতে পারে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্বৈত নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত মনোনয়ন বাতিলের ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক আসনে দেখা গেছে, যা প্রার্থীদের নথি প্রস্তুতির দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত প্রমাণ সংগ্রহে সমন্বয় ঘাটতির দিকটি সামনে আনে। আপিল কর্তৃপক্ষ, উচ্চ আদালত বা সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক ব্যাখ্যার আলোকে যদি নাগরিকত্ব ত্যাগের কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়, তবে বাতিল সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সুযোগ থাকে; তবে সে পর্যন্ত প্রার্থীর নির্বাচনী বৈধতা পুনঃস্থাপিত নয়।
সরকারি দপ্তরে বিক্ষোভ, কর্মকর্তাকে হুমকি প্রদান ও দরজায় ধাক্কাধাক্কির ঘটনা গণপ্রশাসনিক শৃঙ্খলা, কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বাধীনতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। প্রশাসনিক সূত্র জানায়, এ ধরনের ঘটনায় প্রযোজ্য আইনে মামলা বা বিভাগীয় অনুসন্ধানের সুযোগ থাকে এবং আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নের দিকটি তদন্তাধীন থাকতে পারে। নির্বাচনকালীন সহিংসতা বা প্রশাসনিক কাজে বাধা সুষ্ঠু ভোট ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নেতিবাচক বার্তা দেয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ মানদণ্ডেও তা অনাকাঙ্ক্ষিত হিসেবে বিবেচিত হয়।
মনোনয়নপত্র বাতিলের আইনি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থীর আপিল দায়ের ও আদালত-পর্যায়ের সম্ভাব্য আইনি লড়াই পরবর্তী নির্বাচনী কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আপিল কর্তৃপক্ষের শুনানি ও সিদ্ধান্ত, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বা নাগরিকত্ব ত্যাগ কার্যকর হওয়ার বিষয়ে যুক্তরাজ্যের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রত্যয়ন পাওয়া গেলে আসনটিতে প্রার্থীর বৈধতা পুনর্বিবেচিত হতে পারে। তবে বর্তমান অবস্থায় রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত বলবৎ রয়েছে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরবর্তী আইনি পর্যালোচনার জন্য অপেক্ষমাণ।


