চাঁদাবাজি মামলায় তাহরিমা জান্নাত সুরভীর কারামুক্তি ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

চাঁদাবাজি মামলায় তাহরিমা জান্নাত সুরভীর কারামুক্তি ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

আইন আদালত ডেস্ক

গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় চাঁদাবাজি, প্রতারণা ও ব্ল্যাকমেইল সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া তাহরিমা জান্নাত সুরভী সোমবার (৬ জানুয়ারি) রাতে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। কারামুক্তির পর মধ্যরাতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম তাহরিমার টঙ্গীর বাসায় যান এবং তার কাছ থেকে মামলার ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য শোনেন। এ সময় এনসিপির একাধিক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে বুধবার (১ জানুয়ারি) মধ্যরাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাহরিমাকে টঙ্গীর নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তাহরিমা টঙ্গীর বাসিন্দা সেলিম মিয়ার মেয়ে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি এলাকায় সক্রিয় ছিলেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি নিজেকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন এবং ফেসবুকে ওই পরিচয় ব্যবহার করে ব্যাপক প্রচারণা চালান। পুলিশি নথি ও মামলার এজাহার অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া ওই পরিচয় পরবর্তীতে আর্থিক প্রতারণা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে।

পুলিশের ভাষ্যমতে, রাজধানীর গুলশানের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মামলা দায়েরের ভয় দেখিয়ে প্রায় আড়াই কোটি টাকা আদায়ের ঘটনায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় ছিল। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই চক্রের নেতৃত্বে ছিলেন তাহরিমা জান্নাত সুরভী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, ওই চক্র মামলা বাণিজ্যের ভয়, মিথ্যা অপহরণ হুমকি ও প্রভাবশালী যোগাযোগ ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করত। এ ঘটনায় গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানায় নাইমুর রহমান দুর্জয় নামে এক যুবক বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন, যেখানে চাঁদাবাজি, অপহরণ করে অর্থ আদায়, ব্ল্যাকমেইল এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। ওই মামলায় তাহরিমার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি ছিল।

মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা জানান, তাহরিমা বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাগত শ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপন করতেন। পরবর্তীতে ওই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য, যোগাযোগ-সূত্র, ছবি ও বার্তা ব্যবহার করে মানহানির ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। প্রাথমিক তদন্তে প্রায় ৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও উঠে এসেছে, যা বিভিন্ন পর্যায়ের আর্থিক লেনদেন, ডিজিটাল বার্তা ও সাক্ষ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নথিভুক্ত করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের তদন্ত এখনও চলমান এবং অর্থের উৎস, লেনদেন-পদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করা হচ্ছে।

গ্রেপ্তারের পর সোমবার (৬ জানুয়ারি) গাজীপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ তাহরিমার দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আদালতের বিচারক সৈয়দ ফজলুল সাহাদী শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। তবে রিমান্ড আদেশের কয়েক ঘণ্টা পর আসামিপক্ষের আইনজীবী জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ফৌজদারি রিভিশন দায়ের করেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে জেলা ও দায়রা জজ আদালত রিমান্ড আদেশ বাতিল করে তাহরিমাকে চার সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন প্রদান করেন। আদালতের আদেশ অনুযায়ী, জামিন চলাকালীন তাহরিমাকে তদন্তে সহযোগিতা, প্রয়োজনীয় শুনানিতে উপস্থিতি এবং ডিজিটাল যোগাযোগ বা প্রভাব খাটিয়ে কোনো আর্থিক লেনদেনে যুক্ত না হওয়ার শর্ত মানতে হবে।

আইন বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রিমান্ড বাতিল ও অন্তর্বর্তী জামিনের আদেশ তদন্তাধীন মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তির সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার রক্ষার অংশ, যা ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার নিয়মিত প্রক্রিয়া। অন্তর্বর্তী জামিন মানে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি নয়; এটি একটি সাময়িক আইনি সুবিধা, যার সময়সীমার মধ্যে তদন্ত শেষ করে পুলিশকে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে এবং মামলার পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এই সময় অভিযুক্ত ব্যক্তি নজরদারির আওতায় থাকবেন এবং তদন্তে অসহযোগিতা করলে জামিন বাতিলের সুযোগ রয়েছে।

এনসিপির পক্ষ থেকে তাহরিমার বাসায় সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সক্রিয় থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার ঘটনাগুলো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে তার বক্তব্যে গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট মন্তব্য, ব্যক্তিগত মতামত ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ থাকায় তা এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, কারণ চলমান ফৌজদারি মামলার রিপোর্টে কেবল তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য ও আইনগত প্রক্রিয়ার বিবরণ উপস্থাপন করা হয়েছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আরও বলেন, এ ধরনের সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজি ও প্রতারণার অভিযোগ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহারের নতুন প্রবণতা নির্দেশ করে, যেখানে সামাজিক পরিচয়, অনলাইন প্রভাব, এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সাইবার অপরাধ, ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইল এবং আর্থিক প্রতারণা প্রতিরোধে প্রযুক্তিগত তদন্ত, ব্যাংকিং লেনদেন বিশ্লেষণ, মোবাইল ডিভাইস ফরেনসিক, এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ডেটা সংগ্রহের মতো পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জামিন চলাকালীন সময়ের মধ্যে পুলিশ সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন, ডিজিটাল বার্তা, সম্ভাব্য সহযোগী ও অপরাধ-সংগঠনের কাঠামো বিশ্লেষণ করে আদালতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে। এই মামলা দেশের ডিজিটাল আর্থিক অপরাধ-সংশ্লিষ্ট আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ এখানে বড় অঙ্কের অর্থ আদায়ের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ অপরাধ-সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে অপরাধের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের মতো উপাদান একত্রে উঠে এসেছে।

আইন আদালত রাজনীতি শীর্ষ সংবাদ